ঘটনাবহুল বিশ্বকাপÑ সবুজ গালিচায়ও ক্ষমতার নৃত্য || ড. জীবন বিশ্বাস
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ মূলত স্মরণীয় হয়ে থাকার কথা ছিল এর বিপুল ব্যাপ্তির জন্য। প্রথম ৪৮ দলের আসর, ১০৪টি ম্যাচ, তিন আয়োজক দেশের সীমান্তহীন মেলবন্ধন এবং ৩২এর নতুন রাউন্ড, সব মিলিয়ে উত্তর আমেরিকা যেন এক মহাদেশজোড়া ফুটবল—মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু নকআউট পর্বের জটিল আবর্তে এসে টুর্নামেন্টের গভীরতর নান্দনিক গল্প বিস্তারের চেয়ে একটি রূঢ় সত্য প্রকট হয়ে উঠল। প্রশ্ন দাঁড়াল কর্তৃত্বেরÑখেলাটিকে আসলে নিয়ন্ত্রণ করে কে? ন্যায়বিচারের ব্যাখ্যাই বা দেয় কে? ফুটবল কি এখনও রাজনৈতিক ক্ষমতার আগ্রাসন থেকে তার চিরায়ত স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম? ফিফার নিজস্ব সম্প্রসারণবাদী নীতি এই বিশ্বকাপকে আকারের দিক থেকে হয়তো ইতিহাসের সর্ববৃহৎ করেছে, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি তাকে করেছে অভূতপূর্ব ভঙ্গুর। বরাবরের মতো এবারেও ঘটেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও দুর্ঘটনা। এসব প্রসঙ্গ নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।
ক্ষমতার অলিন্দ ও মাঠের ব্যাকরণ
এই বিশ্বকাপের মূল নাটক ছিল ফোলারিন বালোগুনের রেড—কার্ড বিতর্ক। ১ জুলাই বসনিয়া—হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় বালোগুন লাল কার্ড পেয়েছিলেন, যার অমোঘ আইনি পরিণতি ছিল পরবর্তী ম্যাচে তাঁর অবধারিত অনুপস্থিতি। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশÑ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের পক্ষে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে দরবার করার পর, ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতারা ইনফান্তিনোর এই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি তোলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল অকাট্য—টুর্নামেন্ট চলাকালে লাল কার্ডের শাস্তিসূত্র ক্ষমতার প্রভাবে বদলে দেওয়া নিরপেক্ষ নিয়মনীতির কপালে চরম কুঠারাঘাত। ফিফা অবশ্য স্বভাবসুলভ চাতুর্যে জানিয়েছে, সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ শৃঙ্খলারক্ষী কমিটির।
আইনের মারপ্যাঁচ বনাম মাঠের সত্য
রাজনৈতিক প্রভাব হয়তো টেবিলের ওপর সাময়িক প্রক্রিয়াগত জয় এনে দিতে পারে, কিন্তু তা রক্ষণভাগের নিশ্ছিদ্র শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কিংবা টুর্নামেন্ট জেতার পরিপক্বতা ধার দিতে পারে না। খেলার চিরন্তন দৃষ্টিকোণ থেকে এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত নিস্ফল প্রমাণিত হয়েছে। বালোগুন রাজকীয় অনুকম্পায় খেলার ছাড়পত্র পেলেন বটে, কিন্তু বেলজিয়ামের দাপুটে ফুটবল—শৈলীর কাছে ৪—১ গোলে চূর্ণ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাউন্ড অব ১৬ থেকেই বিদায় নিল। এখানেই এই কেলেঙ্কারির পরম এবং নগদ বিদ্রুপ। বেলজিয়ামের এই জয় ফুটবলের সেই প্রাচীন সহজ সত্যটিকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলÑম্যাচের আগে ক্ষমতার দম্ভ যতই আস্ফালন করুক না কেন, শেষ উত্তরটি লিখে দেয় সবুজ মাঠই। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোÑতিন আয়োজক দেশেরই কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিদায় নেওয়া টুর্নামেন্টকে এক বিষাদময় প্রতীকে রূপ দিয়েছে। আয়োজকরা ঘটা করে ঘর বানাল, আলো আর জাঁকজমকে তা পূর্ণ করল, তারপর দেখলÑসেই ঘরের উত্তরাধিকার চলে গেল অন্যের হাতে।
দুই মহাকাব্যের শেষ পরিচ্ছেদ
আয়োজকদের এই পতনের সমান্তরালে বৈশ্বিক ফুটবলের দুটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল। পর্তুগাল রাউন্ড অব ১৬—এর মহারণে স্পেনের কাছে ১—০ গোলে পরাস্ত হলো। মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের সেই নিষ্ঠুর গোলটি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপের মহাকাব্যে যতিচিহ্ন টেনে দিল। ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবল—তারকা নিশ্চিত করেছেন যে এটাই তাঁর শেষ বিশ্বমঞ্চের লড়াই। এই বিদায় তাঁর দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গৌরবগাথাকে বিন্দুমাত্র ম্লান করে না, তবে তাঁর রেকর্ডের খতিয়ানে এক শূন্যতা চিরকালের জন্য থেকে গেলÑগোল, ট্রফি ও দীর্ঘায়ুর সমস্ত অতিমানবীয় মহিমা সত্ত্বেও সোনার বিশ্বকাপটি অধরাই রয়ে গেল।
নেইমারের বিদায়
ব্রাজিলিয়ান জাদুকর নেইমারের বিদায়ে ছিল আরও নিখুঁত এক কাব্যিক দীর্ঘশ্বাস। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের ২—১ গোলের অভাবনীয় পরাজয়ের পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন। কি অদ্ভুত ঘটনা, নেইমারের জীবনের বৃত্তটিও সম্পূর্ণ হলো একই চত্বরে। ২০১০ সালে কিশোর নেইমার যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রথম আন্তর্জাতিক গোলের খাতা খুলেছিলেন, ২০২৬ সালে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই নরওয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করলেন নিজের শেষ আন্তর্জাতিক গোল। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোলের এক দীর্ঘ খতিয়ান, যার পরতে পরতে জড়িয়ে রইল অসামান্য প্রতিভা, বারবার থমকে যাওয়া চোটের আঘাত, প্রত্যাশার পর্বতপ্রমাণ চাপ, জাদুকরী সৃজনশীলতা এবং একটি ট্রফিহীন দেশের অপূর্ণ আর্তি।
রোমাঞ্চের আখ্যান ও নীরব মহিমা
রোনালদো ও নেইমার যদি অবসান আর ক্ষয়িষ্ণু সময়ের প্রতীক হন, তবে আর্জেন্টিনা দেখাল কীভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে ফিরতে হয়। আটলান্টায় মিশরের বিপক্ষে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা যখন ২—০ গোলে পিছিয়ে, ঘড়ির কাঁটায় তখন নিয়মিত সময়ের মাত্র ১১ মিনিট বাকি। ঠিক তখনই শুরু হলো লিওলেনের দেশের সেই অতিপ্রাকৃতিক প্রত্যাবর্তন। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোল, ৮৩ মিনিটে লিওনেল মেসির জাদুকরী সমতাÑযা টুর্নামেন্টে তাঁর অষ্টম এবং বিশ্বকাপে সামগ্রিকভাবে ২১তম গোল এবং সবশেষে ইনজুরি টাইমে এনজো ফার্নান্দেজের সেই জয়সূচক আঘাত। আর্জেন্টিনার ৩—২ ব্যবধানের এই জয় কেবল মাঠের ফল ছিল না, তা ছিল ইতিহাসের স্রোতকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার এক অদম্য ঘোষণা। তবে মিশরের ক্ষোভকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিতর্কিত রেফারিং আর বাতিল হওয়া গোলের ক্ষত বুঝিয়ে দিল, মহৎ প্রত্যাবর্তনের আলোছায়াতেও অবিচারের কিছু দীর্ঘশ্বাস জমা থেকে যায়।
অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড উপহার দিল এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নীরব অথচ ক্ল্যাসিক মহিমা। ভ্যাঙ্কুভারে কলম্বিয়ার বিপক্ষে নিস্তরঙ্গ ০—০ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৪—৩ ব্যবধানের জয় সুইসদের পৌঁছে দিল এক ঐতিহাসিক শিখরেÑ১৯৫৪ সালের পর প্রথমবার তারা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের অতিমানবীয় সেভ এবং রুবেন ভার্গাসের স্নায়ুশীতল পেনাল্টি এক নিস্তেজ ম্যাচকে রাতারাতি জাতীয় রূপকথায় বদলে দিল। এটি ছিল কলম্বিয়ার জন্য আরও একটি পেনাল্টি—ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আর সুইজারল্যান্ডের জন্য সংযম, নিরেট রক্ষণ—বুদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধৈর্যের পরম পুরস্কার।
কেপ ভার্দেÑ ক্ষুদ্র দেশ বিশাল অন্তর
আর্জেন্টিনা ও কাবো (কেপ) ভার্দের মধ্যকার রাউন্ড অব ৩২—এর লড়াইটি ছিল নিঃসন্দেহে অন্যতম চমকপ্রদ ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ। টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়া কাবো ভার্দে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল; ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৩—২ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে টিকে থাকে। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে ড্র করে টুর্নামেন্টের নবাগত কাবো ভার্দে সবার নজর কাড়ে এবং এক রূপকথার গল্পের জন্ম দেয়। মায়ামি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক নকআউট ম্যাচেও তারা ফুটবল বিশ্বের পরাশক্তিদের দেখে বিন্দুমাত্র ভীত হয়নি।
ফুটবলের নতুন ব্যাকরণ ও কর্পোরেট অবয়ব
এই বিশ্বকাপ ফুটবলের আদি ও খাঁটি সাংস্কৃতিক ব্যাকরণটিকেও অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল ম্যাচে কোল্ডপ্লের ক্রিস মার্টিনের ভাবনায় ১১ মিনিটের এক জমকালো ‘সুপার বোল’ ধাঁচের হাফটাইম শো—এর আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে জাস্টিন বিবার, ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস, বার্না বয় এবং গুস্তাভো দুদামেলের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা এক মঞ্চে সুর বাঁধবেন। এটি কেবল বিনোদনের কোনো খেলো অনুষঙ্গ নয়; বরং ফিফার সেই সুদূরপ্রসারী অভিসন্ধির অংশ, যেখানে ফুটবলকে আমেরিকান প্রদর্শনী—পুঁজিবাদের নগ্ন আগ্রাসনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গীত, তারকাখ্যাতি এবং খেলাকে এক কর্পোরেট মোড়কে বন্দী করার এই আয়োজন আধুনিক ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়েরই ইঙ্গিত দেয়।
শেষ কথা: বিবেকের সংকট
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে ফুটবল তার চিরন্তন আত্মাটি হারিয়ে না ফেললেও তার আত্মাকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। দলসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে টুর্নামেন্ট হয়তো কিছুটা গণতান্ত্রিক হয়েছে, ক্ষুদ্র জাতিগুলো পেয়েছে বিশ্বমঞ্চের আলো; কিন্তু বালোগুন—কান্ড রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের বিপজ্জনক আনুগত্যকে উলঙ্গ করে দিয়েছে।
ফুটবলের এই বিশাল মঞ্চে প্রেসিডেন্ট, পপতারকা, কর্পোরেট স্পন্সর কিংবা সম্প্রচারক সংস্থাকে স্বাগত জানানো যেতেই পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতে রেফারি বা নিয়ামকের বাঁশি তুলে দেওয়া যায় না। খেলার সৌন্দর্য নির্ভর করে জনগণের আস্থার ওপর; সেই আস্থা হলো খেলা শুরুর আগেই নিয়মগুলো জানা থাকে, খেলার সময় সেগুলো প্রয়োগ করা হয় এবং প্রভাব খাটিয়ে পরে আর তা বদলে ফেলা হয় না। সেই পবিত্র বিশ্বাসটুকু যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গোলটিও এক প্রহসনের মঞ্চে কেবলই ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ যেমন রোমাঞ্চকর ও ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ, তেমনই তা বিশ্বফুটবলকে এক চরম সতর্কবার্তা দিয়ে গেল—খেলাটিকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে শুধু তার জাঁকজমক নয়, তার সহজাত বিবেকটুকুকেও আগলে রাখতে হবে।
