গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— সতেরো ঝিনুকের ভিতর সুরের নীল সমুদ্র নির্মলা মিশ্র
এমন কিছু শিল্পী আছেন যাদের কণ্ঠস্বর শুনলে মনে হয়, আষাঢ়ের মেঘলা দুপুরে জানালার পাশে বসে কেউ একাকী এক বান্ডিল পুরনো চিঠি খুলে বসেছে। গ্রামোফোনের পিন যখন ঘুরতে শুরু করে, কিংবা ট্রানজিস্টরের নব ঘুরিয়ে যখন সেই চেনা সুরটা ঘরে এসে ধরা দেয়, তখন চারপাশের চঞ্চল কোলাহল আচমকা যেন নতজানু হয়ে থমকে দাঁড়ায়। তেমনই এক ঘরোয়া সুর—কন্যা নির্মলা মিশ্র, যিনি বাঙালির বৈঠকখানায় কোনো সুদূর আকাশের তারকার মতো হঠাৎ উদিত হননি বরং এসেছিলেন চেনা ঘরের আত্মীয় হিসেবে একরাশ স্নিগ্ধতা নিয়ে। শিল্পী নির্মলা মিশ্র—বাঙালির আবেগের এক এমন একান্ত আশ্রয়, যাঁর গায়কী শুনলে মনে হয় সুর যেন শ্রোতার কানের খুব কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলছে এক গোপন ও অলিখিত বেদনার উপাখ্যান। তাঁর কণ্ঠের গভীরতা মাপার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ এক বিকেলের শান্ত নির্জনতা।
এই সুর—সাধিকা নির্মলা মিশ্র ১৯৩৮ সালের ২১ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার মজিলপুরের এক বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে পিতার পেশাগত কারণে মিশ্র পরিবার কলকাতার চেতলার আদি বাসিন্দা হয়ে ওঠেন। সেই চেতলার চেনা ঘরটিতেই ২০২২ সালের ৩১ জুলাই এক নিস্তব্ধ গভীর রাতে এই সুর—পাখির ইহজাগতিক যাত্রার অবসান ঘটে। পিতা পন্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্র ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক প্রাজ্ঞ পুরুষ, আর মাতা ভবানী দেবীর স্নেহময়ী আঁচল ছিল সেই সুরের আদি পাঠশালা। উল্লেখ্য, এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের আদি পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অগাধ পান্ডিত্য ও মিশ্র রাগের ওপর অসামান্য দখলের কারণে কালক্রমে তাঁরা ‘মিশ্র’ উপাধিতেই সমাজ ও সঙ্গীতজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মুরারিমোহন মিশ্রের যোগ্য সাহচর্যে নির্মলার শৈশব কেটেছিল সাঙ্গীতিক আবহে। গান তাঁর কাছে কোনো তোতাপাখির মতো মুখস্থ করা বিদ্যা ছিল না, তা ছিল তাঁর প্রতিদিনের নিঃশ্বাস—প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক ও অনায়াস প্রয়াস।
সুরের নবজন্ম
শৈশবে নির্মলা মিশ্রের প্রস্তুতি কিন্তু লঘু সঙ্গীত বা আধুনিক গানের জন্য ছিল না। তিনি তৈরি হচ্ছিলেন ধ্রুপদের একনিষ্ঠ সাধিকা হিসেবে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই কঠিন ও গম্ভীর আঙিনায় তাঁর সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিন্তু নিয়তির এক নিষ্ঠুর ও অলিখিত পরিহাসে জীবনের মোড় আচমকা ঘুরে যায়। কৈশোরে এক মারাত্মক টাইফয়েডের আক্রমণে তাঁর কণ্ঠনালী ও দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকরা সাফ জানিয়ে দিলেন, ধ্রুপদের মতো কঠোর ও শ্রমসাধ্য কণ্ঠচর্চা তাঁর শরীরের জন্য চরম বিপজ্জনক হতে পারে। সাধারণ কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এমন বিপর্যয় হয়তো স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটিয়ে অবসাদের কালো গহ্বরে ঠেলে দিত। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর জেদ এখানেইÑযিনি ভাঙনের ভেতর থেকেই গড়ে তোলেন এক নতুন সৃষ্টির প্রাসাদ। ধ্রুপদের সেই কঠোর অনুশাসন, লঘু সঙ্গীতের সহজাত মাধুর্য এবং গানের বাণীর প্রতি এক অমোঘ সংবেদনশীলতা মিলে তাঁর কণ্ঠে তৈরি হলো এক সম্পূর্ণ নতুন ব্যাকরণ। ধ্রুপদের রাগ—কাঠামোটি ভেতরে লুকিয়ে রইল এক গোপন শক্তি হিসেবে, আর বাইরে প্রকাশ পেল আধুনিক গানের এক আশ্চর্য কোমল অবয়ব।
দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধন ও ওড়িয়া চলচ্চিত্রের তোরণ
পিতার কাছে সঙ্গীতের প্রথম পাঠ নেওয়ার পর তিনি একে একে তালিম নিয়েছেন সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবী ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ মজুমদার এবং প্রবীর মজুমদারের মতো প্রথিতযশা গুণীজনদের কাছে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যখন তাঁর কণ্ঠ বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করল, তখনই চলচ্চিত্র জগতের জহুরিদের চোখে পড়েন তিনি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তপন সিংহের ‘কালামাটি’ ছবিতে বিশ্ববরেণ্য সেতারবাদক পন্ডিত রবিশংকরের জাদুকরি সুরে নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম অভিষেক ঘটে। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি এসেছিল ১৯৬০ সালে, যখন ওড়িয়া চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীত পরিচালক বালকৃষ্ণ দাস তাঁকে ‘শ্রী লোকনাথ’ ছবিতে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এই একটি ঘটনা কেবল ওড়িশার সঙ্গীতভুবনের সোনালী তোরণই উন্মুক্ত করেনি, বরং নির্মলা মিশ্রকে বাংলা ও ওড়িয়া—দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষার ও সংস্কৃতির মাঝে এক অনন্য ও অবিনাশী সুরের সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যাচ্ছিলেন না, বরং দুই ভাষার ভিন্ন আবেগকে নিজের কণ্ঠে পরম মমতায় একাত্ম করে নিয়েছিলেন।
মধ্যবিত্তের মানস—আর্কাইভ ও ঝিনুকের দর্শন
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে নির্মলা মিশ্রের নাম নিলেই যে গানটি বাঙালির অবচেতনে প্রথম দোলা দেয়, তা হলো—‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’। এই গানটি কিন্তু কেবল সাড়ে তিন মিনিটের সুরের বিন্যাস নয়, এটি আসলে মানুষের অনন্তকাল ধরে এক অধরা স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার দার্শনিক ইশতেহার। মানুষ জীবনভর এক মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে মুক্তোর সন্ধান করে, কিন্তু দিনশেষে তার ঝুলিতে জমা হয় কেবলই কিছু শূন্য ঝিনুকের খোলস। তাঁর গায়কীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—সেখানে কান্নার তীব্র হাহাকার আছে কিন্তু তার কোনো সস্তা বা উচ্চকিত প্রদর্শন নেই। প্রেম আছে, কিন্তু তার ভেতরে কোনো চড়া সুরের চিৎকার নেই। গভীরতম অভিমানও তাঁর কণ্ঠে এসে এক শান্ত মায়ায় রূপ নেয়, যা কখনো অভিযোগের কোলাহলে রূপান্তরিত হয় না। এই অলৌকিক সংযমই ছিল তাঁর সাঙ্গীতিক আভিজাত্যের আসল পরিচয়। ‘বলো তো আরশি তুমি মুখটি দেখে’, ‘কাগজের ফুল বলে’, কিংবা ‘আমি তো তোমার চিরদিনের হাসি কান্নার সাথী’—এই গানগুলো নিছক কোনো বিনোদন নয়, এগুলো বিশ শতকের মধ্যবিত্ত বাঙালির মানস—আর্কাইভ, এক গোপন সুখ—দুঃখের দলিল। তিনি কথার ভেতরের যে অব্যক্ত নীরবতা, সেই নীরবতাকেও আশ্চর্য দক্ষতায় গেয়ে যেতেন।
ওড়িশার লতা মঙ্গেশকর
ওড়িয়া সঙ্গীতজগতে তাঁর অবদান এতটাই বিশাল যে, ওড়িশার আপামর শ্রোতাসাধারণ তাঁকে ভক্তির সাথে ওড়িয়া প্লেব্যাকের ‘লতা মঙ্গেশকর’ বলে সম্বোধন করেন। ‘নিদা ভরা রাতি মধু ঝরা জানহা’ কিংবা ‘মো মন বীণা রে’র মতো গানগুলো ওড়িশার আকাশ—বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় এক অলৌকিক সুরের মায়াজালে। কয়েকশো ওড়িয়া গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি সে রাজ্যের মানুষের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে সঙ্গীতজগতের অভিজাত অলিন্দে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ অকৃত্রিম ও খোলামেলা। সহকর্মী ও অনুজদের কাছে তিনি অত্যন্ত আদরের ‘ঝামেলাদি’ নামে পরিচিত ছিলেন। এই অদ্ভুত সম্বোধনটির ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আন্তরিকতা, খামখেয়ালিপনা আর প্রথাবদ্ধ গাম্ভীর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখানোর এক সহজাত সাহস। ওড়িশা সরকারের ‘গান গন্ধর্বী’ সম্মান, সঙ্গীত সুধাকর বালকৃষ্ণ দাস পুরস্কার থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ ‘বঙ্গবিভূষণ’—তালিকায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির কোনো কমতি ছিল না তাঁর। তবে তাঁর আসল ও পরম পুরস্কারটি ছিল ধুলোমাটির পৃথিবীর সাধারণ মানুষের গুনগুনানিতে, যাঁরা আজও কোনো এক অলস বিকেলে একলা বসে গেয়ে ওঠেন—‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’।
নির্মলা মিশ্রের গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গানঃ
১। এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, ২। তোমার আকাশ দুটি চোখে, ৩। ও তোতা পাখি রে, ৪। বলো তো আরশি তুমি মুখটি দেখে, ৫। কাগজের ফুল বলে, ৬। আমি তো তোমার চিরদিনের হাসি কান্নার সাথী, ৭। আবেশে মুখ রেখে, ৮। আজ কোনও কাজ নেই হাতে আমার, ৯। আকাশে নেই চাঁদের দীপ, ১০। চাঁদ করে ঝলমল, ১১। চলো আজ কিছু পথ চলে যাই, ১২। অনেক সোনালী দিন, ১৩। সন্ধ্যাবেলার একটু হাওয়া, ১৪। মনে করো মনে মনে, ১৫। যেও নাকো বধূ থাকো আরও কিছুক্ষণ, ১৬। আকাশ পাড়ে তারায় তারায়, ১৭। তারাদের কানে কানে, ১৮। দূরে আকাশ কাছে তুমি, ১৯। যা যা রে আমার ময়না, ২০। কেউ কথা বোলো না গো, ২১। রিমিঝিমি রিমিঝিমি শ্রাবণের, ২২। সবুজ পাহাড় ডাকে, ২৩। পাহাড়ে বিকেল নামে, ২৪। কখন যে প্রজাপতি, ২৫। এই বাংলার মাটিতে মাগো জন্ম আমায় দিও
পরিশেষ
নির্মলা মিশ্র তাঁর সুরের দীর্ঘ যাত্রায় প্রমাণ করে গেছেন যে, মহৎ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোনো কৃত্রিম ঢাকঢোলের প্রয়োজন হয় না। তা কখনো কখনো আসে এক স্নিগ্ধ শান্ত বিকেলে নরম ও মায়াবী উচ্চারণে, কিন্তু তবুও তা মানুষের বুকের গহীনে এক চিরস্থায়ী সিংহাসন পেতে বসে। তাঁর কণ্ঠের সেই অভূতপূর্ব মায়াজাল বাংলা গানের উঠোনে এক চিলতে মায়াবী আলোর মতোই এসে পড়েছিল, যা হয়তো কোনো ঝলসানো আলো তৈরি করেনি, কিন্তু অন্ধকারের বুক চিরে পথ চিনে নেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট। পার্থিব নিয়মে, কালচক্রের আবর্তে মানুষ হারিয়ে যায় কিন্তু ঝিনুকের বুকে লুকোনো নির্মলা মিশ্রের সেই সুরের নীল সমুদ্র যে বাঙালির আত্মিক চেতনার বাতিঘর হয়ে অনন্তকাল অক্ষয় ও অম্লান হয়ে থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
