শাওনকেই কেন দায়িত্ব নিতে হলো || মনজুর কাদের

শাওন কি আওয়ামী লীগ করেন? তিনি কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব নিতে গেলেন?

না তিনি আওয়ামী লীগ করেন বলে কখনো কেউ শোনেনি। তবু তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি জানেন, মানুষের জীবন মহিমান্বিত। এই জীবন কুকুর বেড়ালের মতো করে যাপন করার জন্য নয়। জীবনের যদি মহিমাই না থাকলো সে জীবন অসম্মানের, সে জীবন বয়ে বেড়ানোর মানে হয় না।

শাওন একা নন। দায়িত্ব অনেকেই নিয়েছেন। রুমিন ফারহানা, রোকেয়া প্রাচী, নারী নেত্রী নীলুফার, গোলাম মাওলা রনি, মনজুরুল আলম পান্না, আনিস আলমগীর, মাসুদ কামাল, মাসুদা ভাট্টি, নবনীতা চৌধুরী অনেকেই শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছেন। এরা কিন্তু কেউ আওয়ামী লীগ করে না। আসলে এরা কেউই আওয়ামী লীগের পক্ষেও বলছেন না। এরা অত্যাচার, অবিচার, অনাচার দেখতে দেখতে তিতি বিরক্ত হয়েছেন। বস্তুত এদের অনেকেই জুলাই আন্দোলনে সমর্থক প্রভাবক ছিলেন। কিন্তু যে আলোকিত স্বপ্নের আশায় বুঁদ হয়ে সমর্থন করেছিলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। এই বিহ্বলতার চক্করে পড়ে তারা যাই বলছেন, সবই আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে যাচ্ছে। এতে করে আওয়ামী লীগ পন্থীরা ভেবে থাকতে পারে, এরা বুঝি তাদের লোক। আদতে মোটেও তা নয়।

এরা জাতে স্বদেশপন্থী। এরা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির পিতা, সংবিধান, পলিমাটি জাতীয় সঙ্গীতে আস্থা রাখে। যদি কোনোদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তখন এরা আওয়ামী লীগকেও ছেড়ে কথা কইবে না। এদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনের চেয়ে আত্মমর্যাদাকে সবার ওপরে মূল্য দেয়। এরা জীবন যাপনের মহিমান্বিত রূপের সঙ্গে হাঁটে।

শাওন এতোটা শক্তি সামর্থ কোথায় পেলেন? তিনি হুমায়ূন আহমেদের সাহচর্য পেয়েছেন। হূমায়ুন আহমেদ মহাপুরুষ ছিলেন সেকথা বলছি না। তবে তিনি শহীদ পরিবারের সন্তান। দেশ যখন রাজাকারের কব্জায় তখন তিনি পাখির ঠোঁট দিয়ে রাজাকারদের গালাগাল করিয়েছেন। হিম্মত সকলের থাকে না। হূমায়ুন আহমেদের ছিলো। মিউচুয়াল ইনডাকটেন্সের ফলে এর একাংশ মেহের আফরোজ শাওনের মননেও চুইয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া নিজের শিক্ষা, সংস্কৃতি মহানদের সাহচর্যও তার সাংস্কৃতিক মান বোধের উচ্চতা বিনির্মাণে সহায়ক হতে পারে।

তাহলে বাকী যারা উচ্চকন্ঠ তাদের কী অবস্থান? তাদের অবস্থান দুরকম হতে পারেঃ

এক. এরা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ এবং আত্মমর্যাদার সাথে কোন কিছুকেই সমকক্ষ করে না।

দুই. এরা দূরদর্শী, কৌশলী চতুর। এরা আগে থেকেই বিছানায় নতুন অতিথির জন্য চাদর বিছিয়ে রাখে।

এরা হয়তো মনে করছে, সময় লাগবে তবে পরিস্থিতি বদলাবে। এদের মধ্যে এই অভিজ্ঞতা এখনো দগদগে যে, পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারিতে সাবেক সরকারের নৌকা ঈশানী দমকায় প্রায় কুপোকাত হতে হতে সামলে উঠেছে। সে সামলানো এমনই সামলানো যে, অভিযোগ উত্থাপনকারী বিশ্বব্যাংকের ওপরের সারির প্রায় সব কর্মকর্তা খোদ জাতিসংঘের একাধিক রাঘব বোয়ালকে চাকরি হারাতে মার্জনা ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়েছে। সেই দল বা সেই সরকারকে কতোদিন আটকে রাখা যাবে সে প্রশ্ন ক্রমাগত বিরাটকায় হতে হতে তাদের মাথায় দোলাচল হচ্ছে।

এই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তাদের মনে এই সম্ভাবনা নিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে যে, পরিস্থিতি বদলালে সবার আগে থালা পেতে হালুয়ার ভাগ পেতে হুটোপুটি শুরু করে দিতে হবে।

এদের আপাত কিছু কর্মকান্ড আওয়ামী লীগের হাঁড়িতে গেলেও এরা মূলত আওয়ামী লীগের এ্যাসেট নয়। শাওনও নন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাদের কৃত অসংগতি নিয়ে শাওন এখনকার চেয়ে বরং কয়েকগুণ বেশীই উচ্চকন্ঠ হবে। 

তাহলে প্রশ্ন হলো শাওনের এই শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানো এতোটা জনপ্রিয় হলো কেন?

বত্রিশ নম্বর ভাঙার সাথে সাথে অনেকেরই হৃদয় ভেঙেছে। সেখানে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। রক্তাক্ত হৃদয়গুলো দিনে দিনে একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা কেউ কেউ এরকম বলে বেড়াচ্ছে, একাত্তরে হারানো স্বাধীনতা চব্বিশে পুনরুদ্ধার হয়েছে। সরকারের আনুকুল্যে লালিত এনসিপি যে মূলত উগ্র মৌলবাদীদের শক্তির নেপথ্য চালিত শক্তি এবং সম্প্রতি তাদের একজন জঙ্গী সদস্য আাতাউল্লাহ শাহের হাতেনাতে ধরা পড়া প্রকাশ্য রাস্তায় দিনে দুপুরে আইএসএর কলেমা খচিত পতাকা নিয়ে দীর্ঘ মিছিল করাÑ এতে স্বদেশপ্রেমী মানুষ আতংকিত হচ্ছে। পিতৃভূমি হাতছাড়া হওয়ার আশংকায় তাদের চোয়াল দৃঢ় হচ্ছে। দেশে বিদেশে অনেকেই বত্রিশ নম্বরের ধ্বংসস্তুপের মাটি সংগ্রহ করে পবিত্র জ্ঞানে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। এই লেখকও সম্প্রতি বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় এই শহরের একজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা কাতরস্বরে তার জন্য এক মুঠো বত্রিশ নম্বর এনে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। মাটির প্রদীপের মতো যৎসামান্য সাধ্য নিয়ে হলেও বিদেশ বিভূঁইয়ে স্বদেশ প্রেমীরা দৃঢ়চিত্তে এখানে সেখানে জোটবদ্ধ হচ্ছে।

ঝিনুকে মুক্তো জমার জন্য একটি বালুকা কণার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের মাটিতে এখন সেই বালুকা কণার অভাব প্রকট। তৃষ্ণার্ত রক্তাক্ত মানুষ একটি বালুকণার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের ধারক বাহক বলে দাবী করে আসছিলো তাদের তো নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। এই শূন্যস্থানে এসে দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়েছে শাওনরা। মানুষ তাদের ঘিরে আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনেই শাওনদের কাঁধে দায়িত্ব এসে ভর করেছে। সুসময় এলে হয়তো শাওনদের এই মৃত্যুঝুঁকি বা কারাবরণের ঝুঁকি কেউ মনেও রাখবে না। না রাখুক। কাউকে না কাউকে তো রুখে দাড়াতে হয়। শাওনরা দাঁড়িয়েছেন। এখন তাদের পেছনে অনেকেই এসে দাঁড়াবেন।


Related Posts