ভ্রমণ গদ্য—৪ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ, ফ্লোরিডা
দূর থেকেই দেখা যায় পাথরের পাহাড়ের মাথায় উঠে গেছে বিশাল অ্যাবি। চারদিক সমতল, কাদা আর জোয়ার—ভাটার বিস্তীর্ণ ভূমি। জোয়ার এলে জল ঘিরে ফেলে পাহাড়টিকে, তখন দূর থেকে মনে হয় সমুদ্রের মধ্যে ভাসছে একটি দুর্গ।
এর ইতিহাসও অদ্ভুত।
মধ্যযুগে এটি ছিল ধর্মীয় তীর্থস্থান, মঠ এবং একই সঙ্গে দুর্গ। শতবর্ষের যুদ্ধে ইংরেজরা নর্মান্ডির বড় অংশ দখল করলেও মন্ট সাঁ—মিশেলকে নিতে পারেনি। জোয়ার আর শক্ত প্রাচীর মিলে পাহাড়টিকে প্রায় দুর্ভেদ্য করে রেখেছিল।
তারপর ইতিহাস ঘুরেছে।
একসময় যে জায়গায় সন্ন্যাসীরা প্রার্থনা করত, সেই অ্যাবিই হয়ে গেছে কারাগার। ফরাসি বিপ্লবের পরে সেখানে রাজনৈতিক ও সাধারণ বন্দীদের রাখা হয়েছে। কেউ কেউ তাকে বলতÑসমুদ্রের বাস্তিল।
ধর্ম, যুদ্ধ, কারাগার।
একটি পাথুরে পাহাড় কত রকম মানুষের ইতিহাস বয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
রাস্তা ওপরের দিকে উঠে গেছে ধীরে ধীরে। সিঁড়ির পরে সিঁড়ি শেষ আর হতে চায় না। বিশাল প্রাচীন গির্জাটি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে।
আমরা টিকিট কেটে ঢুকি।
গির্জার সামনে দেয়ালঘেরা আঙিনা থেকে উন্মুক্ত হয়েছে অন্তহীন প্রান্তর। দূরে লা মানসের উপসাগর, আর নিচে কুয়েনোঁ নদী পাহাড়টির পাশ ঘেঁষে গিয়ে মিশেছে সেই জলরাশিতে।
ভাটার সময় বলে জল নেই। শুধু বালুর ওপর জলের পাতলা প্রলেপ চিকচিক করছে রোদে।
মানুষের হাতখানেক দূরে দেয়ালে বসে একটি গাঙচিল মাথা নাড়ছে আর চেঁচাচ্ছে অবিরাম।
যেন সে দাবি করছে কিছু।
খাদ্য?
সম্ভবত।
কিন্তু দেওয়া নিষেধ। অবশ্য সঙ্গে নেইও কিছু।
‘এত দূর উঠেছ খালি হাতে? রিয়েলি?’
চেঁচানোর ভঙ্গিটা এমন।
সবাই ক্লিক ক্লিক ছবি তুলছে।
যেন এই কালজয়ী বিশাল স্থাপনার জীবন্ত সত্তা ও উদাত্ত কণ্ঠ সে।
প্যারিসের হোটেলে পৌঁছাতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে যায়।
শহরের কেন্দ্রস্থলে ছোট খব এৎবু ঐড়ঃবষ।
একটি রাস্তার নাম চোখে পড়ে—জঁব খবপষবৎপ।
সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল আলেহো কার্পেন্তিয়ের এই জগতের রাজত্ব উপন্যাসের লেক্লের্ককে।
নেপোলিয়নের ভগ্নিপতি, পলিন বোনাপার্টের স্বামী, সাঁ—দোমিঙ্গে পাঠানো ফরাসি বাহিনীর প্রধান।
রক্তাক্ত হাত।
হাইতির স্বাধীনতার স্থপতি তুসাঁ লুভেরতুরকে যুদ্ধে পুরোপুরি পরাজিত করতে পারেনি। আপসের পরে লেক্লের্কের অধীনস্থ জেনারেল ব্রুনেট তাঁকে আলোচনার অজুহাতে ডেকে প্রতারণার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে। তারপর জাহাজে তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফ্রান্সে।
তিনি আর স্বদেশে ফিরে আসতে পারেননি।
এরপর লেক্লের্ক বিদ্রোহ দমনের কৌশল জানিয়ে নেপোলিয়নকে লিখেছিলÑপাহাড়ের সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ ও নারীকে ধ্বংস করতে হবে; শুধু বারো বছরের নিচের শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে।
একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার পরিকল্পনা ছিল তার।
কিন্তু হলুদ জ্বর তার জীবন কেড়ে নেয়।
পরিকল্পনাটি আর বাস্তবায়িত করতে পারেনি।
মুহূর্তের জন্য ভাবি, এই রাস্তা কি তার নামে?
পরে জানতে পাই, না।
রাস্তার নামটি তার নয়। একই নামের বহু পুরনো এক স্থানীয় জমির মালিকের নামে এই নাম।
কিন্তু লেক্লের্কের ইতিহাস ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বিবেকের নগ্নতারই ইতিহাস।
আমেরিকার আদিবাসী নেতা ক্রেজি হর্সের কথাও মনে পড়ে। দীর্ঘ যুদ্ধের পরে নিজের জনগণের জীবন বাঁচানোর আশায় তিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পরে ফোর্ট রবিনসনে তাঁকে বন্দী করার চেষ্টা হলে ধস্তাধস্তির মধ্যে সৈন্যের বেয়নেটের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
উপনিবেশে যে রক্তাক্ত খুনি, স্বদেশে সে বীর, মহান।
মহাদেশ বদলায়।
মানুষ বদলায়।
সাম্রাজ্যের কৌশলগুলো আশ্চর্যভাবে পরিচিত থেকে যায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মিউজিয়ামগুলোর অন্যতম ল্যুভর ঘুরে বেড়াই।
এক বা দুদিনে দেখে শেষ করার মতো স্থান নয়।
দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে রাজা ফিলিপ অগাস্ট প্যারিসে একটি প্রতিরক্ষা দুর্গ তৈরি করেন। পরে তা রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। রাজারা সেখানে থেকেছেন, প্রাসাদের কলেবর বেড়েছে, ঝলমল করেছে মানুষের রক্তের রঙে আঁকা বৈভব।
তারপর বিপ্লব আসে।
রাজারা চলে যায়।
১৭৯৩ সালে রাজপ্রাসাদের দরজা উন্মুক্ত হয় মিউজিয়াম হিসেবে।
যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল না, সেখানে এখন এত মানুষের ভিড় যে ঢোকাই দায়।
ইতিহাসের রসবোধ আমাদের রসবোধের চেয়ে উত্তম।
বিশাল লাইন।
প্রতিটি কক্ষে লোক গিজগিজ করে।
যে দেয়াল থেকে জাকোন্ডা মোনালিসা রহস্যের হাসি হাসছে, তার দিকে তাকিয়ে আছে কয়েকশ মানুষ। বিশাল কক্ষে তিল ধারণের স্থান নেই।
দা ভিঞ্চি নিজে হয়তো এই গরমে এত মানুষ ঠেলে তাঁর ছবির কাছে যেতে দেখে কেঁদে ফেলতেন।
প্রাচীন গ্রিস আর মিশরের ইতিহাসের আরও দুই—তিনটি সেকশন দেখি। সিঁড়ি বেয়ে এত বেশি ওপর—নিচ করতে হয় যে ঘণ্টা তিনেক পরে আমার ভাঙা হাঁটু বেঁকে আসে, পা আর চলে না।
বের হয়ে আসি।
সেইন নদীর বাঁধানো তীর ধরে হাঁটি নটর—দামের দিকে।
সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরজুড়ে নেভা ও অসংখ্য খাল—নদীর বাঁধানো তীর ধরে যৌবনে হাঁটার যে অনুভূতি হতো, অনেকটা সেই অনুভূতি ফিরে আসে।
সেন্ট পিটার্সবুর্গ প্যারিসের চেয়ে বয়সে ছোট। পিটার দ্য গ্রেট ইউরোপের শহরগুলো দেখে নিজের রাজধানীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই প্যারিসের অনেক নান্দনিক ইমারতের মধ্যে আমি যেন আমার পুরনো শহরের আত্মার অবয়ব খুঁজে পাই।
নদীতীরের সৌন্দর্যে কোনটি বেশি সুন্দর বলা কঠিন।
হয়তো পরে তৈরি, বয়স কম বলে সেন্ট পিটার্সবুর্গ একটু বেশি সুন্দর।
অথবা ওটা আমার ভালোবাসার পক্ষপাতিত্ব।
যে শহরে আমি বড় হয়েছি, মানুষ হয়েছি, ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি, এবং যে ভালোবাসার বয়স চল্লিশÑতার প্রতি কিছুটা পক্ষপাত থাকতেই তো পারে।
নয় কি?
একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকি।
ওয়েটারের মুখটি বাঙালির।
বাঙালি নাকি?
না, মানে হ্যাঁ। আমার জন্ম ফ্রান্সে, আমার বাবা—মা লন্ডনের, দাদু সিলেটের।
কী অদ্ভুত শিকড় মানববৃক্ষের!
আমার মেয়ের জন্ম রাশিয়ায়, ছেলের কানাডায়, নাতির আমেরিকায়।
আমি পদ্মাতীরের এঁটেল মাটির পুতুল।
শ্বেতা ভলখভ নদীর স্রোত।
লেট লাঞ্চ সেরে নটর—দামের লাইনে দাঁড়াই।
তাতানো রোদ।
গরমে গা পোড়ে।
ছাতা বের করি।
লোকের অভাব নেই।
সারা পৃথিবী থেকে আসা মানব—সুন্দরের লাইন ধীরে ধীরে নড়ে।
আটশ বছরেরও বেশি বয়স এই গির্জার। দ্বাদশ শতকে নির্মাণ শুরু। শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে দেখেছে রাজাদের মেজাজ, রক্তচক্ষু, ব্যভিচার, বিপ্লব, যুদ্ধ, প্রার্থনা, ধ্বংস..
নিজেও অপমানিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফরাসি বিপ্লবের সময়। উনিশ শতকে একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে এর ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভিক্টর হুগো ঘড়ঃৎব—উধসব ফব চধৎরং উপন্যাসের মাধ্যমে আবার মানুষের চোখ ফিরিয়ে আনেন এই পুরনো ঐতিহ্যের দিকে।
২০১৯ সালের আগুনে ছাদ ও চূড়া পুড়ে ধসে পড়ে। সারা পৃথিবীর মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে দেখে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য।
আবার তৈরি হয়।
আবার দরজা খুলেছে।
জাপানি কবি কামো নো চোমেই মানুষ আর তার বাসস্থানের অনিত্যতার কথা লিখেছিলেন।
কোনটি আগে হারিয়ে যায়Ñমানুষ, না তার ঘর?
