অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতায় গদ্যসত্য || বদরুজ্জামান আলমগীর
অ্যালেন গিন্সবার্গ এক কালসিটে দ্যুতি, তীব্র ধারালো কার্বোনাডোÑ যে কালো সময়ের হীরক কাটে; তাঁর এই অখন্ড জমাট আসে নিউজার্সির প্যাটারসন অঞ্চলের নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত হার্ডনক লাইফের প্রতিবিম্বের অভিজ্ঞানে, নিউইয়র্ক গ্রিনউইচ ভিলেজের নিঃসঙ্গ আলো ও নৈর্ব্যক্তিক গোঙানি থেকে, তার ভিতর জ্যাক কেরোয়াক, উইলিয়াম বোরোজ আর অ্যালেন গিন্সবার্গের দেখা হওয়া, ওখান থেকে বীজ নিয়ে উড়ে যাওয়া স্যানফ্রেন্সিসকো নর্থবিচ পাড়ায় পরিপূর্ণ রূপে অভিব্যক্ত হয়ে ওঠে বিট জেনারেশনের সীমানা ডিঙানো স্পন্দন।
বিট জেনারেশনের মত এমন সর্বপ্লাবী এক শিল্পÑরাজনৈতিক, সামাজিক বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকম্প তৈরি করবার জন্য অতি অবশ্য মেধাবী ও সৃজনশীল লোকদের সম্মিলন হতে হবে, তারপরও বিট জেনারেশন সময়ের অভিঘাত, দুঃসময়ের জের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সারা দুনিয়ার শিল্প—সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, সমাজত্তত্ব ও ইতিহাসে নানা মাত্রার ভাঙচুর ও নবতর দিশা সংযোজন করে।
সবকিছুর ভিতর অ্যালেন গিন্সবার্গের হাউল এক মৌলিক ঘন্টাধ্বনি। হাউল ভাঙা মানুষের এক প্রতিপক্ষ বাইবেল। বাইবেলের ভিতর থেকেই আসে মলোচের হাত ধরে হাউল, বা হাউলের গোপাট ধরে মলোচ। কিন্তু সে বাইবেলের সুবচন উগরায় না, বরং তা পুঁজিবাদী দমবন্ধ সময়ের অন্তঃপুরে আড়ালে আবডালে রেন্ডম মানুষের নাল্লত নিয়ে এক তথাকথিত অশ্লীল প্রার্থনা। ওখানে হিব্রু বাইবেলের সুস্থিতির বদলে আটপৌরে, লন্ডভন্ড মানুষের থিতানো ঘা থেকে উঠে আসে নতুন দিগ্বলয়ের বিচ্ছুরণ। হিব্রু বাইবেলে যেমন মলোচ সমস্ত শিশুদের বিনাশ করে, শিল্প পুঁজিও সেভাবেই মানুষের গৃহকাল তছনছ করে ঠেসে ধরে যা গিন্সবার্গ বিবৃত করেন কবিতার গদ্যে।
ওই এক সময়, বাকবান কী নির্বাক, একা কী সমন্বয়ী লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী অনন্য এক তরঙ্গ সৃষ্টি করেনÑ কেউ কবিতায়, কেউ ইজেলে, কাউকে দেখি দেওয়ালের গ্রাফিতির ভিতর, রাস্তায়, বস্তির পাঞ্জাখানায় প্রার্থনা ঘরে, কখনো আগুনের ফুলকিতে, হঠাৎ হয়তো তা বিচ্ছুরিত হয়ে ওঠে চোখের জলে।
সেই সময়ে এতো যে অন্তর্মুখী, ক্ষরণশীল সিলভিয়া প্লাথÑ তাঁর একটি কবিতা পড়ে দেখি; তিনিও কতোটা সমন্বিত একা, সময়ের অভিঘাতে কতোটা বিচলিত।
বাবা: সিলভিয়া প্লাথ—
না ঈশ্বর নয়, বরং তা ভয়াল স্বস্তিকা
ঘুটঘুটে কালো আকাশের দেখা নাই,
সব মেয়েই কোন না কোন স্বৈরাচারে লিপ্ত
বুটের তলায় থেঁৎলানো মুখ অভিযুক্ত।
ছটফট, দমবন্ধ এই যে সামনে জানোয়ার
তুমিই সেই বন্ধ দরজা বিভীষিকা হুঙ্কার।
সিলভিয়া প্লাথের বাবা কবিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের ক্ষরণ, সর্বনাশচিহ্নিত লেলিহান— পুরোপুরি বিবৃত, কিন্তু তাঁর কাব্যিক স্বরটি খুবই প্রাতিস্বিক, স্বগতোক্তির উপমায় সেলাই করা; মোটামুটি একই সময়ের ছাউনির নিচে হলেও হারলেমের কবি ল্যাংস্টন হিউজের প্রকরণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তাঁর মিল নেই চার্লস বুকোওস্কি, কী অ্যালেন গিন্সবার্গের কাব্যভঙ্গিমার সাথেও।
একইভাবে চার্লস বুকোওস্কি সময়ের সর্বনাশের ভিতর মুখ গুঁজে আছেন, কিন্তু বিট জেনারেশন থেকে তাঁর ঢেউটি আলাদা, সবাই নিজের নিজের পরিসরে শ্বাস নেবার চেষ্টা করছেন। তাই সেই সময় নানাভাবে গড়ে উঠেছে পপ কালচার, বিমূর্ত শিল্পকলা, ফ্লাক্সাস, কনসেপচুয়াল শিল্পকলাসহ আরও অনেক বাঁক ও অন্বেষা ভঙ্গিমা। পাবলো নেরুদা, ল্যাংস্টন হিউজ, মায়া এঞ্জালো, হারলেমের কবিরাÑ একই অগ্নিঘোরের অধীন কিন্তু নিজের নিজের স্বরে বসা।
যোজন মাইল দূরের দুটি দেশ, কিন্তু হাওয়ার তীব্র বৃংহতির ভিতর কর্দমাক্ত মাটির বীজতলায় ঠিক জন্মায় একই আগুনের লেলিহান বীজ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসে অ্যালেন গিন্সবার্গ লেখেন হাউল, কলকাতায় মলয় রায় চৌধুরী লেখেন প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার :
ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কি কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য—ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে
ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না,অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফূলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কাল রূপে প্রসব করলে না কেন?
কলকাতার হাংরি আন্দোলন অনেকটাই আমেরিকার বিট জেনারেশন দ্বারা সিদ্ধিপ্রাপ্ত ছিল। ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় এসেছিলেন, কলকাতায় মলয়রায় চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও উৎপল কুমার বসুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আড্ডাও হয়।
নবারুণ ভট্টাচার্য কবি পুরন্ধর ভাটের মুখে একই কর্কশ অভব্য কবিতার সংশ্লেষ আঁকেন এই ভাষায়, বিভঙ্গে বাংলায়, এগুলো সেই সময়ের নানামাত্রার কাব্যিক বীজমন্ত্র—
চেয়ার—পায়খানাতে হাগে বড়লোক
বড়লোক কাগজেতে হেগো পোঁদ মোছে
গরীবেরা মাঠে হাগে, তেড়ে আসে জোঁক
গরীব নালার জলে হেগো পোঁদ ছোঁচে।
গিন্সবার্গের মনন ভিত্তি তৈরি করে ওয়াল্ট উইটম্যানের কবিতা, প্রধানত তাঁর লিভস অব গ্রাস। উইটম্যান সিভিল ওয়ারের নৃশংসতা, গণতন্ত্রের জন্য তীব্র বাসনা, এমনকি যৌনতাসহ রূঢ় বাস্তবের বয়ান এক খসখসে গদ্যসত্যের জমিনে দাঁড় করানÑ যা অ্যালেন গিন্সবার্গকে কবিতার নবতর বিন্যাসে বিপুলভাবে রুজু করে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর দুনিয়ার মৌলিক ও কেন্দ্রীয় হাহাকার খুঁড়ে তুলতে চাইছিলেন গিন্সবার্গ— তাঁর মরমিয়া দীপ্র ও গভীর। তাঁর অভীষ্ট চাঁছাছোলা, নির্ভীক আর রগচটা— বানোয়াট ভালোমানুষির মিথ্যা সুশীল প্রলেপ সেখানে নেই, আছে এক নৃশংস বোঝাপড়া, ফাটা চিৎকার। তার প্রমাণ নানাভাবে তাঁর লেখায়, সাক্ষাৎকারে বিন্যাসকৃত।
তিনি মার্কসবাদে পাঠ নিয়েছিলেন, কিন্তু গিন্সবার্গ ফর্মুলা রপ্ত করায় স্থিত হননি, অ্যালেন অধিকারে আনতে চাইছিলেন মানুষের অদৃশ্য আত্মার নকশা, প্রাণভোমরার জ্যামিতি। তাই তিনি মার্কসবাদ আর অস্তিত্ববাদী দর্শনের জলহীনতায় মিশাতে চেয়েছেন বুদ্ধের নতমুখ মাধুরি।
বাংলা অঞ্চলের মানুষের কাছে অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রাতঃস্মরণীয় তাঁর সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতার কল্যাণে। কতোটা পরম বন্ধু হলে তিনি এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন শরণার্থী শিবিরে, শরিক হয়েছিলেন রক্তমাংসের মানুষের কর্কশ ভোগান্তির সাথে। এবং তাঁর ওই কবিতার সোজাসাপটা বয়ানে কোন কাব্যিক কৌলিন্য নাই, আছে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে দুর্ভাগ্যের মুখ ঘষাঘষি লেনদেন, খাঁটি বন্ধুর বরাভয় ও উদ্বেগ। তাই তিনি আমাদের একদম ঘরের মানুষের মায়ায় বলতে পারেন—
কতো কতো বাবা আজ দিশাহারা
কতো যে পুত্র ঘুরছে বাস্তুহারা?
অগণিত কন্যাশিশু অনাহারে পথ চলে
কতো চাচা জেঠা গোঙায় পা ফুলে।
লক্ষ শিশু ক্ষুধা যন্ত্রণায় কাতরায়
লক্ষ মা বৃষ্টিতে ভিজে পথ হাতড়ায়
অযুত নিযুত ভাইয়ের চোখে আন্ধার
অগণন শিশুর ঘর নাই মাথাটি গোঁজার।।
এই প্রথম দেখিÑ কবিতা অশ্লীলতা, আধ্যাত্মিকতা, পুণ্যার্থ ও রাজনৈতিক পরম্পরার এক ঘূর্ণায়মান বিন্দুতে এসে ঘন হয়ে বসে, নিচে বয়ে যায় আগুন ও জলের কীর্তি।
