অনিশ্চয়তার জগদ্দল পাথর

কোনো দেশেই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি না হলে সে দেশে বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়। বৌদ্ধিক বিকাশ না ঘটলে ন্যায় ও অন্যায়, নৈতিকতা ও অনৈতিকতা, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়। সেসব দেশই আপাত গণতান্ত্রিক পথে সফল হয়েছে যেসব দেশ গোড়া থেকেই শিক্ষার প্রতি প্রকৃত মনোযোগ দিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা যাতে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার ও কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা ও পশ্চাদপদতা থেকে মুক্তি অর্জন করতে না পারি তার জন্য কোনো সরকারই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কার করেনি। গত ৫৫ বছর পর এখন স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়, কোনো সরকার তা চায়নি। চায়নি তার কারণ রাজনৈতিক। চাইলে কোনো এক সরকার সেটার সূচনা করত। পরের সরকার হয় এগিয়ে নিতো বা বন্ধ করে দিত। বরং জনগণের বা দরিদ্র অভিভাবকদের চোখে ধূলো দেয়ার জন্য বিনামূল্যে স্কুলের শিক্ষার্থীদের বই দেয়া হয়েছে, স্কুল শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে, মেয়েদের শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুনলে মনে হতে পারে সরকার বুঝি অত্যন্ত শিক্ষাবান্ধব।

মূল প্রশ্ন যদি করা হয়, যে বই বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে তাতে নিভুর্ল ও বিজ্ঞানসম্মত, বয়স মাফিক বই দেয়া হচ্ছে কিনা। এই বই পড়ে ছেলেমেয়েরা কী শিখছে, তার মান নিরূপণ করলে বোঝা যায়। বিনামূল্যে শিক্ষা দেয়ার বিষয়টিও একই। অনেক সরকার বাজেটে শিক্ষাখাতে বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে তারা চায় ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠুক। কিন্তু তাও চোখে ধূলো দেয়ার নামান্তর।

বাংলাদেশে কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, কতগুলো কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো তার মানদন্ড নিরূপণ করাও জরুরী। এইসব কলেজে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে প্রধান আলোচ্য সেই প্রসঙ্গ নয়।

উন্নত দেশে প্রাইমারি বা এলিমেন্টারি লেভেলের শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। তাদের যা শিক্ষা দেয়া হয় তা সার্বক্ষণিক গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। ক্লাসরুমকে করা হয় শিক্ষার্জনের মিউজিয়ম বা পার্ক। দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো থাকে বর্ণমালা, মানচিত্র, বিজ্ঞানীসহ মহাজনদের ছবি। অংকের ডিজিট, যোগ—বিয়োগ—গুণ—ভাগ। যে কাগজে বা ম্যাটেরিয়ালে বই ছাপা হয় তা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, বইএর কোনা রাউন্ড থাকে যাতে তারা আঘাত না পায়। কাগজ থাকে পুরু যাতে আঙুল কেটে না যায়। তাদের কতক্ষণ পড়ানো হবে, কতক্ষণ বিরতি দেয়া হবে, কতক্ষণ খেলতে দেয়া হবে সবই নির্ধারিত। ইদানিং যেমন থ্রি—কে, প্রি—কে ক্লাস চালু করা হয়েছে, সেখানেও শিশুদের এমনভাবে নারচার করা হয় যে তারা যেন আনন্দ পায়।

শিশুরা ধীরে ধীরে যে বড় হয়, বছর শেষে নতুন ক্লাসে যায়, তারা বুঝতে পারে। সেই বোধটাও তাদের তৈরি করে দেয়া হয়। শিক্ষকদের আচরণ উচ্চতর পর্যায়ে যায়। প্রতিটি ক্লাস অনুযায়ী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তারা কীভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলবে, তাদের সাথে আচরণ করবে। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কথা আপ্তবাক্যের মতো হৃদয়ে ও মননে ধারণ করে।

এমন কি স্কুলে শিক্ষার্থীরা যা খাবে তার পুষ্টিগুণ, যে পানি পান করবে তা কতটা স্বাস্থ্যকর তাও নিরূপণ করা হয়। সেই সাথে ক্লাসরুমের দেয়ালে যে পেইন্ট ব্যবহার করা হয় তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা, এসবেস্টস বা লেড আছে কিনা তা কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়।

আর চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, ৬ মাস পরপর ক্লাস হিসাবে শিক্ষার্থীদের ম্যাথ, ইংরেজি ও লেখার মান যাচাই করে বিভিন্ন স্বাধীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। স্কুলে সেল ফোন, ল্যাপটপ বা আইপ্যাডে ইন্টারনেট যে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে, তা যখন জানা গেল, তখন এসব গ্যাজেট ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হল।

বাংলাদেশে আসি। বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুল ভবনগুলো কেমন, তাদের ছাদ আছে কিনা, পরিবেশ স্বাস্থ্যকর কিনা, প্রয়োজনীয় বেঞ্চ আছে কিনা, শিক্ষার্থীর তুলনায় স্কুলের অনুপাত ঠিক কিনা, এসব নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা কম। প্রাইমারি বা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাদানের যোগ্যতা আছে কিনা, শিক্ষকদের বেতন দিয়ে তাদের সংসার চলে কিনা এসব নিয়ে আন্দোলন হয়। অনশন ধর্মঘট হয়। আন্দোলন করলে শিক্ষকদের লাঠিপেটা করার উদাহরণ আছে। এসবই শিক্ষার প্রতি সরকারের প্রচন্ড অনীহা দায়ী। তাছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতি এতটাই প্রকট যে স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ দলের কিংবা মিলিটারি শাসকদের মনমতো পদ্ধতিতে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে ভুল শিক্ষা দেয়া হয়। যেমন, ধরা যাক, পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা স্কুলে জানল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯৪ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। আর এর প্রধান পুরুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামে একজন নেতা, যিনি বাঙালি জাতির পিতা। সরকার পরিবর্তনের পর জানা গেল একাত্তর বলে কিছু ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হয়নি। সেটা ছিল কতিপয় মানুষের হট্টরোল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামে কেউ যে ছিলেন, তিনিও সম্পূর্ণ নাই হয়ে গেলেন। এই দেশটি যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে কীভাবে বাংলাদেশ হলো সেই ইতিহাস মুছে দেয়া হলো। ঐ শিক্ষার্থীদের মনে এই অপরিণামদশীর্ আচরণ কী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে তা কেউ ভাবল না? অথচ এটা গুগল সার্চ ইঞ্জিনের যুগ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিক সৎ নয়। তাদের সেই কূপমণ্ডূকতা যাতে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বুঝতে না পারে, সে জন্য তাদের মেধা ও মননের বিকাশ ঘটুক স্কুলে তা হয়ত তারা চায় না। আগে বলা হতো মিলিটারি জান্তা—সরকার তাদের অন্যায় ও অনৈতিক আচরণ যাতে জনগণ বুঝতে না পারে, তার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন চায় না। পরে দেখা গেল রাজনীতিকরা আরো কয়েক কাঠি ওপরে।

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাতেই প্রচন্ড বৈষম্য রয়েছে। কেউ পড়ছে বাংলা মাধ্যমে, কেউ ইংরেজি মাধ্যমে, কেউ নিচ্ছে ধমীর্য় মাধ্যমে শিক্ষা। প্রকৃতপক্ষে কেউই শিক্ষা অর্জন করছে না। তারা বৃত্তাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, যে কারণে যে শিক্ষার্থীরা ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মুখের ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায়নি, যারা ১৯৫২ সালে মাতৃভাষাকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বন্দুকের নলকে ভয় করেনি, ১৯৬১ সালে বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিল আর ১৯৬৯ সালে জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকা মিলিটারি শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, আর একাত্তর তো আছেই, আজ তারা বিভ্রান্ত, আজ তারা বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য ভাঙে, স্বল্পকালের জন্য ক্ষমতায় গিয়েও অর্থের লোভ সামলাতে পারে না।

যেহেতু অধিকাংশ রাজনীতিক চায় না দেশের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হোক, তাই বলা খুব দুঃসাধ্য যে বাংলাদেশ কোনোদিন স্ববুদ্ধিতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কিনা। শিক্ষায় অনিশ্চয়তা মানে সবকিছু অনিশ্চিত।

Related Posts