৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ নিউ হ্যাম্পশায়ার আ প্রেয়ার ফর ওয়েন মিনিঃ জন আরভিং || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

জন আরভিংয়ের ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত উপন্যাস আ প্রেয়ার ফর ওয়েন মিনি মূলত দুই বন্ধুর গল্পÑজন হুইলরাইট এবং ওয়েন মিনি। তাদের শৈশব কাটে নিউ হ্যাম্পশারের কাল্পনিক ছোট শহর গ্রেভসেন্ডে। শহরটির মধ্যে আরভিংয়ের নিজের নিউ হ্যাম্পশার—অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। নিউ ইংল্যান্ডের পুরনো পরিবার, গির্জা, স্কুল, ছোট শহরের সামাজিক সম্পর্ক এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি উপন্যাসটির আবহ নির্মাণ করেছে।

গল্পটি আমাদের শোনান জন হুইলরাইট। তিনি প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে ওয়েনের কথা বলেন। ফলে শুরু থেকেই আমরা বুঝতে পারি—, ওয়েন তার জীবনে সাধারণ কোনো শৈশবের বন্ধু ছিল না; তার বিশ্বাস, জীবন এবং মৃত্যু জনকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

ওয়েন মিনি দেখতে অন্য শিশুদের মতো নয়। সে অস্বাভাবিকভাবে ছোট, শরীরও দুর্বল। তার কণ্ঠস্বর এত অদ্ভুত ও তীক্ষè যে শুনলেই তাকে আলাদা করে চেনা যায়। উপন্যাসে ওয়েনের সংলাপ বড় হাতের অক্ষরে ছাপা হয়েছেÑযেন তার কণ্ঠটি বইয়ের পাতাতেও অন্য সবার কণ্ঠ থেকে পৃথক।

কিন্তু ছোট শরীরের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ আত্মবিশ্বাসী এক মন। ওয়েনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো তার ঈশ্বরবিশ্বাস। সে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না; তার বিশ্বাস, ঈশ্বর তাকে একটি বিশেষ উদ্দেশে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

জনের বিশ্বাস কিন্তু ঠিক উল্টো। ধর্ম নিয়ে তার মনে প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। পরবর্তী জীবনে সে যে বিশ্বাস অর্জন করে, তার মূলে থাকবে ওয়েনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।

জনের মা ট্যাবিথা হুইলরাইট সুন্দরী, স্নেহশীল এবং কিছুটা রহস্যময় নারী। জন তার বাবার পরিচয় জানে না। ট্যাবিথাও ছেলেকে বাবার নাম বলেন না।

একদিন ছোটবেলায় জন ও ওয়েন বেসবল খেলছিল। ওয়েন খুব ভালো খেলোয়াড় নয়। কিন্তু হঠাৎ তার ব্যাটে অসাধারণ একটি শট লাগে।

বলটি গিয়ে আঘাত করে জনের মায়ের মাথায়।

তিনি মারা যান।

ওয়েন ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করেনি, এটি নিছক দুর্ঘটনা। তবু ঘটনাটি দুই বন্ধুর জীবন চিরতরে বদলে দেয়। আশ্চর্যের বিষয়, জন ওয়েনকে ঘৃণা করতে পারে না। তাদের বন্ধুত্ব টিকে থাকে, বরং আরও গভীর হয়।

ওয়েনের কাছে ঘটনাটির অর্থ আরও রহস্যময়। সে ভাবতে শুরু করে, হয়তো এই দুর্ঘটনাও কোনো বৃহত্তর ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েনের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে তার জীবন পূর্বনির্ধারিত। একসময় সে এমন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, যার ফলে তার বিশ্বাস জন্মায় যে সে নিজের মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ইঙ্গিত পেয়েছে।

এখান থেকেই উপন্যাসটি সাধারণ কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার গল্প থেকে ধীরে ধীরে নিয়তি, ভবিষ্যদ্বাণী ও ধর্মীয় বিশ্বাসের রহস্যময় কাহিনীতে পরিণত হয়।

পাঠক তখন একটি প্রশ্ন নিয়ে এগোতে থাকেনÑ

ওয়েন কি সত্যিই ঈশ্বরের নির্বাচিত কোনো কাজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, নাকি সে নিজের বিশ্বাসের মধ্যে ঘটনাগুলোর অর্থ খুঁজে নিচ্ছে?

আরভিং দীর্ঘ সময় এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন না।

জন ও ওয়েন স্কুলজীবনে বারবার একটি বিশেষ কৌশল অনুশীলন করে। জন ওয়েনকে তুলে ধরে, আর ছোটখাটো ওয়েন তার শরীর ব্যবহার করে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছায়। অনেকটা বাস্কেটবলের বিশেষ ধরনের অনুশীলনের মতো।

প্রথমদিকে বিষয়টি ছেলেমানুষি বলে মনে হয়।

কিন্তু এই উপন্যাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑপ্রথম দিকে যে ছোট ঘটনাগুলো অর্থহীন মনে হয়, শেষদিকে দেখা যায় সেগুলোর প্রায় প্রত্যেকটিরই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য ছিল।

এই অনুশীলনটিও তেমন।

জন ও ওয়েন বড় হতে হতে আমেরিকাও বদলে যায়। ১৯৬০—এর দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ, রাষ্ট্র ও ধর্ম নিয়ে প্রশ্নÑসবকিছু তাদের জীবনে প্রবেশ করে।

ওয়েন অত্যন্ত ধর্মবিশ্বাসী হলেও অন্ধভাবে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মেনে নেয় না। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তার তীব্র আপত্তি রয়েছে। জনও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এখানে আরভিং ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের গল্পের সঙ্গে আমেরিকার একটি অস্থির ঐতিহাসিক সময়কে জুড়ে দেন। ফলে গ্রেভসেন্ডের শান্ত নিউ হ্যাম্পশার জীবন আর বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না।

ওয়েন এক পর্যায়ে এমন একটি কঠোর কাজ করে যার ফলে জনের সামরিক বাহিনীতে যাওয়ার সম্ভাবনাই কার্যত শেষ হয়ে যায়। বন্ধুর জন্য তার ভালোবাসা কতটা গভীর, ঘটনাটি তার একটি চরম উদাহরণ।

উপন্যাসের শেষ অংশে ওয়েন সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। কিন্তু তার ভাগ্য তাকে ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে অন্য ধরনের দায়িত্বে নিয়ে যায়।

তারপর আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য যেন পুরো উপন্যাসটি প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

একটি স্থানে কয়েকজন শিশুসহ মানুষের মধ্যে হঠাৎ হাতবোমা এসে পড়ে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময়।

ওয়েন বুঝতে পারে কী করতে হবে।

জনের সঙ্গে বছরের পর বছর যে বিশেষ শারীরিক কৌশলটি সে অনুশীলন করেছিল, সেই দক্ষতাই এবার কাজে লাগে। ওয়েন নিজের ছোট শরীর এবং সেই অনুশীলনের সুবিধা ব্যবহার করে হাতবোমাটিকে এমন জায়গায় সরিয়ে দেয় যাতে অন্যরা বেঁচে যেতে পারে।

শিশুরা রক্ষা পায়।

কিন্তু ওয়েন মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং মারা যায়।

তখন জন এবং পাঠকÑহঠাৎ বুঝতে পারে, ওয়েনের জীবনের অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেন এই একটি মুহূর্তের দিকে এগিয়ে আসছিল।

তার অস্বাভাবিক ছোট শরীর, তার বিশ্বাস, মৃত্যুকে ঘিরে তার পূর্বানুভূতি, জনের সঙ্গে বছরের পর বছর করা সেই অদ্ভুত অনুশীলন—Ñসবকিছু যেন শেষ পর্যন্ত একই বিন্দুতে এসে মিলে যায়।

তাহলে উপন্যাসটি আসলে কী নিয়ে?

এটি শুধু ওয়েনের আত্মত্যাগের গল্প নয়। আরও গভীরে এটি বিশ্বাস ও সংশয়ের গল্প।

জন শুরুতে নিশ্চিত বিশ্বাসী নয়। অথচ ওয়েন এমনভাবে জীবনযাপন করে যেন সে নিশ্চিতÑতার জীবনের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওয়েনের জীবনের ঘটনাগুলো জনকে এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় যার সহজ যুক্তিবাদী উত্তর তার কাছে নেই।

ওয়েনের মৃত্যু কি নিছক কয়েকটি ঘটনার অস্বাভাবিক সমাপতন? নাকি সত্যিই তার জীবন কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ ছিল?

জন আরভিং পাঠককে জোর করে একটি উত্তর গ্রহণ করান না। কিন্তু জন হুইলরাইটের কাছে ওয়েনই হয়ে ওঠে বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

এই কারণেই আ প্রেয়ার ফর ওয়েন মিনি একদিকে বন্ধুত্ব ও আত্মত্যাগের উপন্যাস, অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস, নিয়তি, মৃত্যু এবং আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে এক দীর্ঘ অনুসন্ধান। আর পেছনে থেকে যায় নিউ হ্যাম্পশারের ছোট শহরের সেই জগৎÑযেখান থেকে দুই বালকের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল এবং যেখানে একটি বেসবলের আঘাত তাদের জীবনের গতিপথ চিরদিনের জন্য পাল্টে দিয়েছিল।

জন আরভিং: সংক্ষিপ্ত জীবনী

জন আরভিং ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিটার, নিউ হ্যাম্পশারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ঝবঃঃরহম ঋৎবব ঃযব ইবধৎং প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি ষোলোটি উপন্যাস লিখেছেন; তাঁর রচনা বিশ্বের ৩৫টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। 

Related Posts