জননেত্রীর জন্মদিন: জনতার কাছাকাছি তিনি প্রতিদিন || আনিস আহমেদ

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে জননেত্রী অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়, তা কি কেবলই একটি উপাধি, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে তাঁর ভালোবাসার কথা। সাধারণত রাজনৈতিক নেতা—নেত্রীরা একাধিক উপাধিতে ভূষিত হন তাঁদের ভক্ত এবং অনুরাগীদের দ্বারা যেখানে বাস্তবতার চেয়ে আবেগ গুরুত্ব পায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি যে চাটুকাররা এই ধরনের শব্দবন্ধের মাধ্যমে নেতা—নেত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও কিছু চাটুকার যে তাঁর অনুরাগীর ছদ্মবেশে তাঁর সর্বনাশ করার চেষ্টা করেনি তা নয়। তিনি ক্ষমতায় থাকার সময়ে এ ধরনের চাটুকাররা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কথায় আছে,  ‘ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না’। কিন্তু সেদিনের এবং  সুদিনের এই কাকরা মুহূর্তের মধ্যেই উড়ে গেল অন্য কোথাও ছড়ানো ভাত খাবার সন্ধানে। তাই তো দেখি এনসিপি’র যে সব নেতা এখন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সারাটা সময় ধরে সোচ্চার, তারাই এক সময় শেখ হাসিনার উন্নয়নের প্রশংসা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধায় পঞ্চমুখ ছিল। আর তারাই সরকার পরিবর্তন ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও জাদুঘর ভাঙতে বিলম্ব করেনি, তারাই শেখ হাসিনার প্রতিটি অর্জনের অবমূল্যায়ন করতে দ্বিধাবোধ করেনি। কিন্তু আমার মতো অরাজনৈতিক মানুষ, যে দলীয় ভাবে কোনো দিক দিয়েই সম্পৃক্ত নয়, সে যখন দেখে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের এই দুঃসময়ে মানুষ তাঁর পাশে থাকতে চায়, তখন অনুভব করি তিনি বাস্তবেই বিতর্কাতীত ভাবে একজন জননেত্রী। 

শেখ হাসিনা অতএব জননেত্রী বলে অভিষিক্ত হয়েছেন কোন উপাধির কারণে নয়, তিনিই বঙ্গবন্ধুর পর একমাত্র ব্যক্তি যিনি জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। প্রকৃত জননেত্রী তিনিই যিনি জনসাধারণের হৃদয়ে স্থান করে নেন। আজ যখন তিনি ক্ষমতায় নেই, তাঁর কাছে কারও যখন তেমন চাওয়া—পাওয়া নেই, তখনও লক্ষ্য করি বহু লোক তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন কখনও সামাজিক মাধ্যমে, কখনও বা  জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে—আয়োজনে। একটি হিসেবে দেখলাম সামাজিক মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রায় নয় কোটি মানুষ। এই সংখ্যা যদি আরও কম হয়, তাহলেও শেখ হাসিনা যে জনতার নেত্রী অর্থাৎ জননেত্রী সে ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ে তাঁর নিরলস অবদান যাঁরা অবজ্ঞা করেছিলেন তাঁরাও আজ সেই সব অবদানের কথা স্মরণ করে অনুতপ্ত বোধ করছেন। পদ্মা সেতু কিংবা মেট্রো রেল অথবা উড়াল সেতুর মতো অভূতপূর্ব সব উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে তিনি যেমন প্রশংসা পেয়েছেন দেশে—বিদেশে, তেমনি তাঁর অসামান্য মানবিক গুণাবলীর জন্যও তিনি জনগণের খুব কাছাকাছি পৌঁছুতে পেরেছেন। শেখ হাসিনার আমলে দেশ যে এত দূর এগিয়ে গেছে সেটা কিন্তু খুব সহজ কাজ ছিল না। নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি দেশের অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছিলেন। একটি উদারনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে উগ্রবাদের মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় রকমের প্রশংসনীয় অর্জন। শেখ হাসিনা শক্ত হাতে উগ্রবাদের মোকাবিলা করেছিলেন এবং জনগণও চেয়েছে উদার গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ সহযোগিতার ভিত্তিতে  সন্ত্রাসবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে গেছে। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এখন সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীরা যে কেবল কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে তাই—ই নয়, এক শ্রেণীর লোকও সন্ত্রাসে লিপ্ত রয়েছে এবং জনগণের জীবন এখন শঙ্কার মধ্যে নিমজ্জিত। 

শেখ হাসিনার মানবিক মূল্যবোধের সব চেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে মিয়ানমারে গণহত্যার মুখোমুখি অন্তত ১২ লক্ষ রোহিঙ্গাকে তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। তাছাড়া করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা করতে তিনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের স্থানে নিয়ে যান। তাঁর লক্ষ্য ছিলো ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে নিয়ে যাওয়া যাতে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টির জন্য এই বিবর্তন সম্ভব হতো। কিন্তু সেখানে এখন প্রতিবন্ধক খাড়া করা হলো। একটি রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনে হেরে যেতেই পারে কিন্তু দলটিকে নিষিদ্ধ করাটা তো সত্যিকার অর্থে স্বৈরতান্ত্রিক বিষয়।  এককভাবে শেখ হাসিনা দেশটিকে ডিজিটাল যুগে, পারমাণবিক জ্বালানি যুগে নিয়ে গেছেন। তাঁর স্থিতিশীল ও প্রায়োগিক নেতৃত্বের কারণে তিনি সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন। সোনার বাংলা গঠনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেকদূর। 

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ও নিঃশর্ত ভালোবাসা। যদিও তাঁর মানবিকতা ও তাঁর শাসনকাল নিয়ে বিভিন্ন মহলে পরস্পরবিরোধী ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেকেই বলেন যে তাঁর দলের লোকেরাই তাঁকে মানবতাবাদী নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু এখন যখন তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নেই এমনকি নিজ দেশেও নেই তখন যখন তাঁকে কোটি কোটি লোক শুভেচ্ছা জানান তাঁর জন্মদিনে, তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশায় প্রতীক্ষিত থাকেন তখন তো সেটি কেবল দলীয় বিবেচনায় মূল্যায়ন করা যায় না। একযোগে প্রায় ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি করে দিয়ে তাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। দিয়েছেন বেঁচে থাকার অবলম্বন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে মানবতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জানা গেছে,  প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে তাঁর দপ্তরের  আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ মানুষকে জমিসহ পাকা ঘর করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৭০ হাজার বাড়ি নির্মাণ করে এই আশ্রয়। পৃথিবীতে এটিই প্রথম এবং একমাত্র ঘটনা; একসঙ্গে এত মানুষকে জমির মালিকানা দিয়ে পাকা ঘর করে দেওয়া। এটি মূলত মুজিববর্ষে গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার। একটি ঘর শুধু একটি আশ্রয়স্থল নয়, যার কিছুই ছিল না এই ঘরটি তার জন্য আত্মমর্যাদার বিষয়। শেখ হাসিনার পরিকল্পনার মধ্যে ছিলো  এই ঘরের মালিকরা সপরিবারে বিভিন্ন সেবা পাবে; শিক্ষা—স্বাস্থ্য, সুপেয় পানিসহ সব নাগরিক সুবিধা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের আওতায় এনে স্বনির্ভর করা হবে। এতে দারিদ্র্যবিমোচন হবে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সে কথা যেমন ভোলেননি যাঁরা সেই আশ্রয় পেয়েছেন তাঁরা, তেমনি ভোলেনি দেশের সাধারণ মানুষ। এই যে জনসাধারণের  আবেগ—ভালোবাসা এটাই তাঁর সাফল্য। এই প্রাপ্তিটাই প্রয়োজন মানুষ হিসেবে। এভাবে সারা দেশের ৯ লাখ পরিবারকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। বেঁচে থাকার স্বপ্ন। টিকে থাকার স্বপ্ন। স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু শেষ অবধি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি সবটুকু, যেটুকু করে গেছেন তাতেই, জনগণ, দলমত নির্বিশেষে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। 

জানি, তিনি ত্রুটি বিচ্যুতির উর্ধে নন, কেউই নয় কিন্তু তাঁর সকল ত্রুটির উর্ধে উঠেছেন তিনি তাঁর মানবতাবোধের কারণেই তিনি প্রকৃত অর্থেই জননেত্রী, জনতারই নেত্রী।

Related Posts