ইরান যুদ্ধ — ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির রণক্লান্তি || ড. জীবন বিশ্বাস
ভূরাজনীতির দাবার ছকে চালটি যখন দেওয়া হয়েছিল, তখন তার গায়ে লেগেছিল এক চরম উত্তেজনার বারুদ। কিন্তু প্রশ্নটি আজ কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানযুদ্ধের গোলকধাঁধায় প্রবেশ করার গূঢ় রহস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটি আরও অনেক বেশি প্রগাঢ়, আরও অনেক বেশি মনোস্তাত্ত্বিক। ২০২৬ সালের এই তপ্ত জুনে এসে কেন হোয়াইট হাউজকে এত তীব্র ব্যাকুলতায় সেই রণক্ষেত্রের যবনিকাপাত টানতে হচ্ছে? ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সূচনা হয়েছিল হয়তো রাষ্ট্রনায়কোচিত এক চিরায়ত মোহে, যেখানে ভাবা হয়েছিল যুদ্ধের দামামা সমগ্র জাতিকে একটি পতাকার নিচে এনে দাঁড় করাবে। কিন্তু মহাকাব্যের সেই খসড়া দ্রুতই রূপান্তরিত হলো পতনের এক নির্মম পাটিগণিতে। জনসমর্থনের পারদ ক্রমশ নিম্নমুখী, জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, আর স্বতন্ত্র ভোটারদের মনে জমাটবাঁধা সংশয়ের মেঘ, এ যেন বহুমুখি অনিশ্চয়তার ওয়েব। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের যে মানচিত্রটি ডেমোক্র্যাটদের ব্যর্থতার খতিয়ান হওয়ার কথা ছিল, তা আচমকাই উল্টে গিয়ে রিপাবলিকানদের শাসনক্ষমতার এক কঠোর বিচারালয়ে পরিণত হয়েছে। এ প্রসংগেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
তিন প্রতিশ্রুতির মরীচিকা ও জনমতের দেওয়াল
যুদ্ধের প্রথম প্রহরে ট্রাম্পের ঝোলায় ছিল তিনটি নিপুণ রাজনৈতিক হিসাব। প্রথমত, এটি ছিল অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাতের ধূসর বাস্তবতাকে আড়াল করে জাতীয় নিরাপত্তা ও শক্তির এক নতুন আখ্যান তৈরি করার সুযোগ। দ্বিতীয়ত, পারস্য উপসাগরের বুক চিরে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার একক কৃতিত্ব নিয়ে ট্রাম্প নিজেকে তেহরানের দর্প চূর্ণকারী একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তৃতীয়ত, এর নেপথ্যে ছিল এক চতুর প্রস্থানের গল্পÑযদি এমন এক শর্তে যুদ্ধ শেষ করা যায় যা দেখতে বিজয়ের মতো শোনায়, তবে নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যুদ্ধের দগদগে ক্ষত নয়, বরং ট্রাম্পের বিশৃঙ্খলার ওপর শৃঙ্খলা আনার গৌরবকেই প্রচার করতে পারবে।
কিন্তু মানুষের মন আর রাজনীতির সমীকরণ সবসময় এক সমান্তরালে চলে না। যুদ্ধের প্রথম আলোড়ন কাটার আগেই জনমতের দেওয়ালে ধাক্কা খেল এই চতুর রণকৌশল। জরিপগুলো দেখাল, মাত্র এক—চতুর্থাংশ আমেরিকান এই আগ্রাসনকে মন থেকে মেনে নিয়েছে। ট্রাম্পের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা নেমে এলো তিরিশের কোঠায়, আর জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি ভরসা তলানিতে গিয়ে ঠেকল। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই সন্ধিক্ষণে এই সংখ্যাগুলো কেবল কাগজের হিসাব নয়, এগুলো আসলে এক কাঠামোগত বিপদের পূর্বাভাস। একজন প্রেসিডেন্ট হয়তো তাঁর ক্ষীয়মান জনপ্রিয়তা নিয়েও হোয়াইট হাউজে টিকে থাকতে পারেন, কিন্তু হাউস ও সিনেটের সাধারণ প্রার্থীদের পক্ষে এই পর্বতপ্রমাণ বোঝা বয়ে বেড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, যখন সাধারণ ভোটাররা সুদূর পররাষ্ট্রনীতিকে সরাসরি তাঁদের রান্নাঘরের চাল—ডাল আর যাতায়াতের তেলের খরচের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন।
হরমুজ প্রণালি: দূরবর্তী সাগর থেকে ঘরের উনুন
হরমুজ প্রণালি কেবল মানচিত্রের বুকে এঁকে রাখা কোনো বিমূর্ত জলরেখা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির এক স্পন্দনশীল ধমনী। সংকটের পূর্বে পৃথিবীর মোট উৎপাদিত তরল পেট্রোলিয়ামের এক—পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই প্রবাহিত হতো। ফলে, সেখানে সামান্যতম অস্থিরতার ঢেউও পারস্য উপসাগর থেকে অতি দ্রুত এসে আছড়ে পড়ে ওয়াশিংটন বা নিউইয়র্কের সাধারণ গৃহস্থের ডাইনিং টেবিলের ওপর। যুদ্ধ সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম, প্রতিটি পণ্যবাহী যানের সারচার্জ, কিংবা পরিবহন—নির্ভর প্রতিটি খাদ্যপণ্যের গায়ে এই যুদ্ধ এক অদৃশ্য কিন্তু ভারী রাজনৈতিক কর বসিয়ে দিয়েছে। ফলে, ইরান হয়ে উঠল পররাষ্ট্রনীতির ছদ্মবেশে এক চরম অভ্যন্তরীণ সংকট।
ঠিক এই কারণেই জি৭—সমর্থিত সাময়িক শান্তি কাঠামোটি হোয়াইট হাউজের কাছে এক পরম সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চুক্তির আসল মহিমা শুধু কূটনৈতিক টেবিলেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি বাস্তব বাজারমুখী চরিত্র রয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার মাধ্যমে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স এখন ভোটারদের বলতে পারবেন যে, প্রশাসন বাণিজ্যপথ অবমুক্ত করেছে, ইরানের পরমাণু উচ্চাকাক্সক্ষাকে লাগাম পরিয়েছে এবং এক অন্তহীন স্থলযুদ্ধের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। চুক্তির আভাস পেতেই তেলের বাজারে যে স্বস্তির হাওয়া লেগেছে, তাকে পুঁজি করেই হোয়াইট হাউজ এখন এক নতুন আশার বয়ান তৈরি করতে ব্যস্ত। সেই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে তা মহাকালের গর্ভে লুকায়িত, তবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য এই সাময়িক স্বস্তির আখ্যানও কম মূল্যবান নয়।
ক্ষয়িষ্ণু জোট ও ক্ষমতার শেষ প্রহর
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী রণকৌশল এখন এক রূপান্তরের খেলার ওপর দাঁড়িয়ে আছেÑ যুদ্ধক্লান্তিকে স্বস্তিতে রূপান্তর, মূল্যস্ফীতির ক্ষোভকে সস্তা জ্বালানির আশায় রূপান্তর, এবং এক অজনপ্রিয় সামরিক অভিযানকে দক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনার দাবিতে রূপান্তর করা। হোয়াইট হাউজের নীতিনির্ধারকরা বিলক্ষণ বুঝেছেন যে, রণহুঙ্কার দিয়ে ভোটারদের মন জয় করা যায়নি, তাই এখন যুদ্ধাবসানের নায়ক সেজে যদি কিছু ফায়দা তোলা যায়। এটি অত্যন্ত রক্ষণাত্মক এক যুক্তিÑযুদ্ধটি ভাল ছিল তা নয়, বরং প্রেসিডেন্ট আরও বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই তা রুখে দিয়েছেন।
তৃণমূলের রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য এই সূক্ষ¥ পার্থক্যটি জীবন—মরণের প্রশ্ন। ২০২৬ সালের এই অগ্নিপরীক্ষায় কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে তাঁরা বিভ্রান্ত। যুদ্ধের অন্ধ আনুগত্য স্বতন্ত্র ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, আবার যুদ্ধের সমালোচনা করলে ক্ষুব্ধ হচ্ছে কট্টরপন্থী দলীয় দুর্গ। এই শান্তি চুক্তি তাঁদেরকে এক নিরাপদ মধ্যপন্থা উপহার দিল, যেখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা শক্তির বন্দনাও করতে পারবেন, আবার উত্তেজনা প্রশমনকে স্বাগত জানিয়ে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবনে ফেরার গানও গাইতে পারবেন।
তবুও এই সুদৃশ্য কৌশলের গভীরে লুকিয়ে আছে কিছু মারাত্মক ফাটল। প্রথমত, এই শান্তি কাঠামো সাময়িক, ট্রাম্পের নিজের যুদ্ধংদেহী সতর্কবাণীই প্রমাণ করে যে কোনো মুহূর্তে এই তাসের ঘর ভেঙে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের দ্বিদলীয় ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। পূর্ণ অনুমোদন ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া এমন দীর্ঘায়িত সংঘাতের বিরুদ্ধে ক্যাপিটল হিলের অস্বস্তি রয়েই গেছে। সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো ট্রাম্পের ২০২৪ সালের সেই বিচিত্র ভোটার জোটের ভাঙন। যে স্বতন্ত্র, কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক ও মেহনতি মানুষ প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল, তারা কম খরচ আর স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিল, নতুন কোনো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জন্য নয়। যুদ্ধ যখন তাদের পকেটে টান ফেলল, তখন সেই বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেল।
জুনের এই শান্তি চুক্তি তাই কোনো দিগ্বিজয়ী বীরের উল্লাস নয়, বরং এটি ডুবন্ত তরণীর এক জরুরি মেরামত অভিযান। এটিকে বলা হচ্ছে, ‘অ উবধষ ঃড় সধশব ধ উবধষ’ বা ‘একটি চুক্তি করার লক্ষ্যে চুক্তি’— এটি এখনো পর্যন্ত কোন চুক্তিই নয়। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির রণক্লান্তি একজন সাধারণ ভোটারের চোখেও এখন দৃশ্যমান। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটাররা অত্যন্ত নির্মম ও বাস্তববাদী হয়ে থাকেন; তাঁরা চুক্তির চোদ্দটি ধারা খুঁটিয়ে পড়বেন না। তাঁরা শুধু দেখতে চাইবেন নভেম্বরের শীতে তাঁদের গ্যাসের বিল কমছে কি না, ঘরের ছেলেরা নিরাপদে ফিরছে কি না। সেই উত্তর যদি ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকে, তবে ইরান যুদ্ধের এই চতুর জুয়াখেলা রিপাবলিকানদের রক্ষা করতে পারবে না। ইতিহাস তখন আবারও এই শিক্ষাই দেবেÑশক্তির দম্ভে যুদ্ধ শুরু করা হয়তো সহজ, কিন্তু সেই আগুনের গ্রাস থেকে নিজের সিংহাসন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত শান্তির শরণাপন্ন হতেই হয়।
