পশ্চিমবঙ্গে মমতার পরাজয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে তিন টুকরো
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ পশ্চিমবঙ্গে একটানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা, মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস যে ভোটের ফল বেরোনোর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, তা অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি।
নির্বাচনে হারলে দলটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকে সেই পূ্র্বাভাস দিলেও সেটা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটতে পারে, তা আসলে ধারণাই করা যায়নি।
অথচ বাস্তবে দেখা গেল, তৃণমূল কংগ্রেস শুধু ভাঙেইনি, আসলে তিন টুকরো হয়ে গেছে বলা চলে। যেটাকে অনেকেই ‘ইমপ্লোশন’ বা ভেতরে ভেতরে চৌচির হয়ে যাওয়া বলে বর্ণনা করছেন।
একদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে সদ্য জেতা বিধায়কদের বেশিরভাগ ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আলাদা ব্লক গঠন করে নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছেন। কলকাতায় কার্যত এই গোষ্ঠীটিই রাজ্য বিধানসভায় শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে মূল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে, দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়নে জেতা লোকসভা এমপি—দের মধ্যে অন্তত কুড়িজন স্পিকারকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, তারা পুরনো দল ছেড়ে ‘এনসিপিআই’ নামে একটি অখ্যাত ও অপরিচিত দলে মিশে যাচ্ছেন — এবং তারা কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এনডিএ—কেই সমর্থন করবেন।
আর এই দুই গোষ্ঠীর থেকেই সম্পূর্ণ আলাদাভাবে — কাগজেকলমে এখনো যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী, সেই মমতা ব্যানার্জী তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই শুরু করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমে দলের এই অংশটিকে মমতা ব্যানার্জীর বাসভবন শহরের যেখানে, সেই এলাকার নামানুসারে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ নামে ডাকাও শুরু হয়ে গেছে।
এবং এই ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র সঙ্গে হাতেগোনা খুব অল্প কয়েকজন নেতা বা জনপ্রতিনিধিই রয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই সে দিনও দোর্দন্ডপ্রতাপে যারা রাজ্য শাসন করছিল — সেই ২৮ বছরেরও বেশি পুরনো একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে মাত্র ২৮ দিনের মধ্যেই এভাবে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে?
বিশেষত যেখানে মমতা ব্যানার্জীর মতো শক্তিশালী, অভিজ্ঞ, জনপ্রিয় ও মানুষের নাড়ির খবর রাখা রাজনীতিবিদ দলটির সর্বময় কর্তৃত্বে ছিলেন — তিনিও কেন দলটির ভাঙন ঠেকতে পারলেন না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিবিসির বিশ্লেষণে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, এই প্রতিবেদনে সেগুলোই একে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে।
তৃণমূলের নির্বাচন—সর্বস্ব রাজনীতি
ভারতের ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পাটি’ কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হলেও তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শ বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, তা নিয়ে চিরকালই বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতা ছিল।
অনেকেই মনে করেন, মমতা ব্যানার্জীর দলে যদি কোনো ‘ইজম’ থেকে থাকে, সেটা ছিল কেবল ‘পপুলিজম’। মানে তিনি সব সময় জনমোহিনী নীতি নিয়ে চলেছেন, মানুষের কাছে যেটা স্বল্পমেয়াদে আকর্ষণীয় হবে সে দিকেই ঝুঁকেছেন।
কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করে বছরের পর বছর ট্রেনে যাত্রীভাড়া বাড়াতে দেননি। ফলে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিরাগভাজন হয়েছেন।
আসলে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের গঠন থেকে শুরু করে ২০১১তে রাজ্যে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তার রাজনীতির এক ও একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল সিপিআইএম—কে হঠিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা।
এই যে একটা দলের রাজনীতির সব কর্মকান্ডের অভিমুখ ছিল যেন তেন প্রকারে নির্বাচনে জেতা — এই নির্বাচন সর্বস্বতার জন্যই এখন মমতা ব্যানার্জীকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস।
পরপর তিনটি নির্বাচনে জেতার পর চতুর্থ নির্বাচনে হারা—মাত্র যেভাবে মমতা ব্যানার্জীর একদা অনুগত নেতারা তাকে ফেলে রেখে অন্য রাস্তায় হাঁটছেন — তা এটাই প্রমাণ করে যে ওই নেতারাও বিশ্বাস করেন ভোটে হেরে গেলে দলটির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
মমতা ব্যানার্জীও সম্ভবত অবচেতনে এটা জানেন — যে কারণে চৌঠা মে নির্বাচনী ফল প্রকাশ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি গণতন্ত্রের রায় মেনে নিয়ে পরাজয় অবধি স্বীকার করেননি। বরং ভবানীপুর কেন্দ্রে তার হারকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতেও গেছেন।
তিনি এমনও বলেছেন, ‘আমি হারিনি, আমাকে হারানো হয়েছে। কাজেই আমি কেন পদত্যাগ করতে যাব?’ বস্তুত তিনি ভোটে হারার পর রাজ্যপালের কাছে কোনো পদত্যাগপত্রও জমা দেননি।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কংগ্রেস, বিজেপি বা অন্য সব আঞ্চলিক বড় দলেরই ভোটে হারার ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু ভোটে হারার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পার্টি উঠে যাওয়ার উপক্রম — এমন দৃষ্টান্ত আর নেই বললেই চলে।
