হাদির হেদায়েত কেন পাঠ্য বইয়ের বিষয়? আনিস আহমেদ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনককে অশালীন ভাষায় যিনি অবমাননা করে গেছেন, তাঁকে অন্তত তাঁর কথাগুলোকে নির্দ্বিধায় বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন—সংক্রান্ত কমিটির এক বৈঠকে এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে ২০২৮ সালের পাঠ্যবইয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির বীরত্বগাথা তুলে ধরা হবে এবং তার জীবন, কর্ম, শাহাদাত ও পরবর্তী ঘটনাগুলোও সেই পাঠ্য বইয়ে থাকবে। কথিত ইনকিলাব মঞ্চের এই সদস্য মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের এবং জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিলেন সে জন্যেই কি তাঁকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত গণজাগরণ মঞ্চের বিপরীতে এই ইনকিলাব মঞ্চকে দাঁড় করানো হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করার মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে। কথিত বিপ্লব বা ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তারা যে বিপ্লব সাধন করতে চায় তা হলো চব্বিশের সেই সুপরিকল্পিত বিস্ফোরণের মতোই বিপ্লবের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের ওপর রিসেট বাটন টিপে দেওয়া যাতে করে এখনকার তরুণ প্রজন্ম ভুলে যায় তাদের অস্তিত্বের প্রকৃত লড়াইয়ের কথা। জুলাইয়ের আন্দোলনে হাদির সম্পৃক্ততা কতখানি ছিল সে নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে জুলাই আন্দোলনের পর, এবারকার এই নির্বাচনের আগে হাদি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর এই হত্যা এবং কোনো হত্যাই সমর্থন করা যায় না। তবে হাদিকে কে বা কারা হত্যা করেছে তা ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে। অতিসরলকৃত বিশ্লেষণে কেউ কেউ বলেন বটে যে হাদিকে ভারত হত্যা করেছে কিন্তু তার কোনো অকাট্য প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। অন্যদিকে অন্যরা অবশ্য বলছেন যে হাদি যেভাবে দ্রুত এক ধরনের সস্তা জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলেন তাতে তাঁকে হয়ত হত্যা করেছে কথিত জুলাই আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকেই কেউ।
হাদির হত্যার পর তার জানাজার নামাজের আয়োজন করা হয় সংসদ ভবন চত্ত্বরে। কিন্তু হাদি কোনো কালেই সংসদ সদস্য ছিলেন না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা যিনি ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দশ বারের নির্বাচিত এই সাংসদ তোফায়েল আহমেদকে সংসদ ভবন চত্ত্বর তো দূরের কথা কোনো খোলা মাঠে নিয়ে গিয়ে জানাজা পড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। হাদির জানাজা নামাজে সদ্য প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা হাদির ভূয়সী প্রশংসা করে যে ভাষণ দিলেন সেটি শুনে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। হাদি অমর, হাদির আদর্শ আমাদের পালন করা কর্তব্য, হাদি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের মনে, এ ধরনের কল্পনা প্রসূত বহু কথাই বলেছেন সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। হাদি হয়ত কিছু লোকের মনে বেঁচে থাকবেন তাঁর অশালীন বাক্যবানের কারণে, বেঁচে থাকবেন মুক্তিযুদ্ধকে ম্লান করে দিয়ে ইনকিলাবকে তুলে ধরার জন্য, বেঁচে থাকবেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর সোচ্চার অবমাননার জন্য। হাদির হেদায়েতে এসব কথাই উঠে এসেছে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার কথা হাদিও বলেছেন। কিন্তু সে কথাতো সকলেই বলেন, এটি অসাধারণ কোনো বক্তব্য নয়। আর এটাও তো জানা প্রয়োজন যে দুর্নীতি তো কেবল অর্থের দুর্নীতি নয়, দুর্নীতি শব্দটিকে আর্থিক অর্থে আবদ্ধ রাখলে শব্দটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে আমরা ব্যর্থ হবো। প্রকৃতপক্ষে নীতির অবমাননা করা এবং নীতি বহিভূর্ত কর্মকান্ডে অংশ নেয়াটাই দুর্নীতির সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। হাদি তো বাংলাদেশের মূল আদর্শ ও নীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, ভারত—বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এটিও একটি দুর্নীতি বা দুষ্ট নীতির অংশ ছিল।
হাদি এখন একজন প্রয়াত ব্যক্তি, তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলার জন্য এ লেখা নয়; এ লেখা তাঁদের বিরুদ্ধে যাঁরা হাদিকে তাঁদের আদর্শ বলে মনে করেন। অথচ হাদি যে বার বার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সে বিষয়ে বেমালুম ভুলে যান। কিসের ভিত্তিতে হাদি বাংলাদেশের স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাঠযোগ্য হচ্ছেন? এই প্রয়াস তো বাংলাদেশের কিশোর—কিশোরীদের মস্তিষ্ক ধোলাই করার একটি প্রয়াস। এমনিতেই বাংলাদেশের তরুণ—তরুণীদের একাংশ এক ধরনের মগজ ধোলাইয়ের কবলে পড়ে চব্বিশের আন্দোলনকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে, কেউ কেউ আবার চব্বিশকে একাত্তরের চাইতেও বড় কিছু মনে করে। এ ধরনের মূঢ়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে বোকা বানানো যায় না, তবুও তাদের এই প্রয়াস অব্যাহত আছে। এখন ধীরে ধীরে জনগণ বুঝতে পারছে যে চব্বিশের আন্দোলন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো আন্দোলন ছিল না, ছিল সেই পাকিস্তানপন্থি গুপ্তদের প্রয়াস যারা বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে ব্যাখ্যা করে এসেছে। দুর্ভাগ্যবশত স্বয়ং হাদিও নিজেই মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের শিকার হয়েছিলেন এবং তারই সংক্রমণ ঘটানোর চেষ্টা করছিলেন অন্যদের মধ্যে। হাদির মৃত্যুর পর এই স্বাধীনতা—বিরোধী ব্যাধির সংক্রমণ ঘটানোর প্রয়াস এখনও থামেনি। বরঞ্চ হাদিকে আদর্শ হিসেবে দেখিয়ে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীরা। হাদির ভারত বিরোধিতাও ছিল প্রধানত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধূলিস্মাৎ করার এক প্রচেষ্টা।
সে কারণেই হাদির কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা কোনো ক্রমেই কাঙ্খিত নয়। বর্তমানে যে বিএনপি সরকার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছে, তাদের মুক্তিযুদ্ধ কি কেবল জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠের মধ্যেই সীমিত, তারা কি এটা বুঝতেও ব্যর্থ হচ্ছে যে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থকরা যদি কখনও ক্ষমতায় চলে আসে তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। পাঠ্যপুস্তকে কেবল ভারত বিরোধী ইনকিলাবি মন্ত্র থাকবে আর তাতেই মগজ ধোলাইয়ের কাজ সম্পন্ন হবে। বিষয়টি গোটা জাতির জন্য কেবল যে দুঃখের তাই—ই নয়, বিষয়টি শঙ্কিত হবার মতো। বাংলাদেশকে একটি নব্য পাকিস্তানে পরিণত করার এ প্রয়াস এক লজ্জাজনক ব্যাপার। যে পাকিস্তানকে আমরা অস্বীকার করে, তিরিশ লক্ষ শহীদের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করেছি এবং বাঙালিকে কেবল তদানীন্তন পাকিস্তানের অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ থেকেই মুক্ত করিনি, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সংক্রমণ থেকেও মুক্ত করেছি, সেই পাকিস্তানের কোনো আদর্শকেই বাঙালি সমর্থন করতে পারে না। পুরনো দিনের সেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভ্রান্ত ন্যারেটিভের দিকে যারা বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চায়, তাদের কথা, তাদের ন্যারেটিভের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দেয়া যেতে পারে না। যে পুস্তক থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নাম পরিহার করা হচ্ছে, তাঁর সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বাদ দেয়া হচ্ছে সেই পুস্তকে হাদির হেদায়েত ছাপানোর দুঃসাহস যারা করছে, তাদের দেশপ্রেম কি কেবল ভারত বিরোধিতার বৃত্তে আবদ্ধ? তেমনটি হলে আমরা কোথায় পাবো আমাদের একাত্তরের সেই বাংলাদেশকে যার স্বাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাসে রয়েছে অগণিত মানুষের রক্তপাত, আরও বহু মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।
