মুক্তিযোদ্ধা খুরশীদ আনোয়ার বাবলু আমার বাবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সেঁজুতি বাংলা, নুসরাত গাজী জয়
আমার বাবা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সংগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরশীদ আনোয়ার বাবলু, কথাটা বলতে আমি সেঁজুতি বাংলা ও আমার ভাই নুসরাত গাজী জয় খুবই গর্ববোধ করি। কারণ তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণ—শ্লোগানের স্মৃতি স্মরণে রাখতে তার পুত্রের নাম জয় ও কন্যার নাম বাংলা রেখেছেন। বাবা যশোরের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। ১৯৬৯—৭০ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন যশোর সিটি ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। তখন থেকেই তিনি বৃহত্তর যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খান টিপু সুলতানের সাথে স্বাধীনতার সংগ্রামের মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতেন। প্রায় রাতেই গোপনে বাবা তার ঘরে বসে সারারাত পোস্টার লিখতেন এবং যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খান টিপু সুলতান, সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম, সহ—সভাপতি হাসান শিবলী, সিটি ছাত্রলীগের সভাপতি এমএ জিন্নাহ, সালেহা বেগম, সাহেবজাদা মোসাদ্দেক, অশোক রায়, রওশন জাহান সাথী, আব্দুল হাই, মতিউর রহমান, মঈন, ওমর ফারুক, মাহফুজ উল হক, মমতাজ বেগম, মশিউর রহমান প্রমুখের সাথে রাতভর যশোর শহরে পোস্টারিং করতেন।
যশোরে আমার বাবা তিন নামে পরিচিতÑ মুক্তিযোদ্ধা বাবলু, গ্রেনেড বাবলু, জাপানি বাবলু। এখন হয়তো আরো একটা নামে পরিচিত, সেটা হলো আমেরিকান বাবলু। তবে যত নামই আমার বাবার হোক না কেন উনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাÑএর থেকে বড় নাম আর বাংলাদেশে হয় না।
আমার ছোট চাচা সুলতান মাহমুদ লাভলু ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে যশোরে প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে মারাত্মক আহত হন। চাচা সুলতান মাহমুদ লাভলুর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আহত হবার ছবি বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।
এবার বলি বাবা খুরশীদ বাবলুর দেশপ্রেমের কথা। স্বাধীনতা বিরোধী কোনো কথাই বাবা নিতে পারেন না। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায় ও উপকার করতে বাবা কখনোই পিছে হটেন নাই। আমি ছোটবেলায় আমার দাদি ফিরোজা বেগমের কাছে শুনেছি আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ মঙ্গলবার সকালে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ক্যাপ্টেন হাফিজ ও লেফটেন্যান্ট আনোয়ারের নেতৃত্বে রিভোল্ট হওয়ার পর আমার দাদা আব্দুল হামিদের দোনলা বন্দুক লায়ন এন্ড লায়ন নিয়ে যশোর জেলা স্কুলের সামনে ইপিআর হেডকোয়ার্টারে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ৪ এপ্রিল রবিবার সকালে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংকের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে মারাত্মক আহত অবস্থায় ৩০/৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা বন্দী হন এবং বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সকলকে বন্দী করে সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টার যশোর সার্কিট হাউসে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে হাত পা ও দাঁত ভেঙে দেয়। অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। অমানুষিক নির্যাতনে আমার বাবা খুরশীদ বাবলু জ্ঞান হারান। বর্বর পাকিস্তানি সেনারা বাবাকে মৃত মনে করে অন্যান্য ৪০/৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নারী পুরুষ কিশোর কিশোরীদের মৃত লাশের সাথে সার্কিট হাউজের পিছনে বাংকারের গর্তে ফেলে দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যায়, আগুন বাবার হাতে পায় লাগলে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বাবার জ্ঞান ফিরে আসলে সেই মৃত্যুপুরি থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে ক্রলিং করে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে পাশের ড্রেনের মধ্যে গিয়ে পড়েন। ড্রেনের ময়লা কাদা পানির মধ্যে দিয়ে হাত পা দাঁত ভাঙ্গা অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে মারাত্মক আহত রক্তাক্ত অবস্থায় শহর থেকে পালিয়ে ৮ মাইল দুরের গ্রামে ফুপুর বাড়ি সুতিঘাটা বলেনপুরে যেতে সক্ষম হন। সেখানে ফুপুতো ভাই ডাক্তার আনোয়ার আলী এমবিবিএস এর চিকিৎসায় বাবা জীবনে রক্ষা পান। বাবা একমাসের উপরে বিছানায় পড়ে ছিলেন, হাঁটতে পারতেন না দাঁড়াতে পারতেন না। পরে ভারতে চলে যান।
মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরের লিয়াজো অফিসার খান টিপু সুলতানের নেতৃত্বে ৩৫ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র ও গোলাগুলি নিয়ে যশোর শহরে ফিরে আসেন এবং জুলাই আগস্ট মাস থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট, যশোর শহর ও শহরতলির পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি ও বাংকারে গেরিলা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেন। আমার দাদির কাছে শুনেছি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো নয় মাস সবসময় দাদি ফিরোজা বেগম উৎকন্ঠায় থাকতেন যে কখন জানি একটা দুঃসংবাদ শুনতে পাবেন।
শুনেছি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক সন্ধ্যায় যশোর টিএ্যান্ডটির টেলিকমিউনিকেশন মেশিন রুম ও টাওয়ার শক্তিশালী এক্সপ্লোসিভ বোমা হামলায় ধ্বংস করার সময় পাকিস্তানি সেনাদের গ্রেনেড হামলার শিকার হন বাবা। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের গ্রেনেড হামলায় বাবার মুখে বুকে পেটে ও হাতে গ্রেনেডের অনেকগুলো স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয়ে আবারও মারাত্মকভাবে জখম হন। সেই গ্রেনেডের বিষাক্ত সূক্ষ্ম স্প্রিন্টারের টুকরো বাবার শরীরের মাংসের সাথে মিশে গেছে, যার কারণে বাবা প্রায় সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন।
বাবা অনেক সাহসী। তিনি সহজে নার্ভাস হন না। আমার ভাই জয় খুবই ছোটবেলা থেকেই বলতো সে আর্মিতে জয়েন করবে। মা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বাবার যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে জয়ের মাথায় এটা ঢুকেছে। সে মা—এর সাথে অনেক ফাইট করে তারপর ইউএস আর্মিতে (ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার) জয়েন করেছে। বাবা সবসময়ই বলেন দেশের জন্য ও মানুষের জন্য কিছু করা উচিত, তাই আমার ভাই জয় এখন আর্মির হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনিয়ার ও পাইলট। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে যশোরের প্রধান ডাকঘরের সামনে আমাদের দাদা বাড়ির ছাদে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা ছিলো, পাকিস্তানি সেনারা সেদিন সেই পতাকা মেশিনগানের গুলি করে ফেলে দেয়। পতাকাটি এখন যশোর সেনানিবাসের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গৌরব অঙ্গনে রাখা আছে। এছাড়াও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যশোরের সর্বদলীয় বিজয় মিছিলের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হাতে আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরশীদ আনোয়ার বাবলুর ছবি যশোর সেনানিবাসে মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর গৌরব অঙ্গনে শোভা পাচ্ছে।
লংআইল্যান্ড, নিউইয়র্ক
