৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ইন্ডিয়ানা দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টার্সঃ জন গ্রিন || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

ইন্ডিয়ানা স্টেটের সাহিত্যভুবনে সমকালীন তরুণ পাঠকের হৃদয় জয় করা যে কটি উপন্যাস স্থায়ী আসন করে নিয়েছে, তার মধ্যে জন গ্রিনের দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টার্স অন্যতম। মার্কিন লেখক জন গ্রিনের এই উপন্যাস কেবল কিশোর প্রেমের গল্প নয়, এটি জীবন, মৃত্যু, ভালোবাসা, বেদনা এবং ক্ষণিক মানবজীবনের গভীর তাৎপর্য নিয়ে এক হৃদয়স্পর্শী ধ্যান। উপন্যাসটির পটভূমি মূলত ইন্ডিয়ানার ইন্ডিয়ানাপোলিসÑ একটি সাধারণ আমেরিকান শহর, যাকে লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নিয়েছিলেন বাস্তবতার মাটিতে গল্পটিকে দাঁড় করানোর জন্য।

সমকালীন আমেরিকান তরুণ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জন গ্রিনের নাম অনিবার্যভাবে চলে আসে। তাঁর লেখা এই বই প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ পাঠকের মনে এক অদ্ভুত আবেগের জন্ম দেয়। এটি এমন একটি উপন্যাস, যা পাঠককে একই সঙ্গে হাসায়, কাঁদায় এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে গভীরভাবে ভাবায়।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হ্যাজেল গ্রেস ল্যাঙ্কাস্টার এক কিশোরী, যে থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত। ক্যানসার তার ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হ্যাজেলের জীবন মূলত হাসপাতাল, অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে। তার মা তাকে বিষণ্ণতা থেকে বের করে আনার জন্য একটি ক্যানসার সাপোর্ট গ্রুপে নিয়ে যান। সেখানেই তার পরিচয় হয় অগাস্টাস ওয়াটার্সের সঙ্গে।

অগাস্টাস বা গাস, নিজেও ক্যানসার থেকে বেঁচে ওঠা এক তরুণ। তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু গাসের ব্যক্তিত্বে মৃত্যুভয় অপেক্ষা জীবনের প্রতি আকর্ষণ বেশি। সে হাসতে জানে, প্রেম করতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। হ্যাজেল এবং গাসের সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে মৃত্যুর উপস্থিতি সত্ত্বেও জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

জন গ্রিন উপন্যাসটিতে এমন কিছু সংলাপ লিখেছেন, যা আজও পাঠকের মনে গেঁথে আছে। গাসের একটি বিখ্যাত উক্তি:

ণড়ঁ ফড়হ মবঃ ঃড় পযড়ড়ংব রভ ুড়ঁ মবঃ যঁৎঃ রহ ঃযরং ড়িৎষফৃ নঁঃ ুড়ঁ ফড় যধাব ংড়সব ংধু রহ যিড় যঁৎঃং ুড়ঁ.”

বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়Ñ এই পৃথিবীতে তুমি আঘাত পাবে কি না, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই; কিন্তু কে তোমাকে আঘাত করবে, তা কিছুটা বেছে নিতে পারো।

এই সংলাপ কেবল প্রেমের নয়, এটি মানুষের সম্পর্কের জটিল সত্যকে ধারণ করে। আমরা যাদের ভালোবাসি, তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিতে পারে, তবু ভালোবাসা থেকে মানুষ সরে আসে না।

হ্যাজেল চরিত্রটি উপন্যাসের সবচেয়ে মানবিক সৃষ্টি। সে মৃত্যুকে নিয়ে রোমান্টিকতা করে না। বরং বাস্তববাদী দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখে। সে জানে তার সময় সীমিত। তাই সে কাউকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চায় না। নিজেকে সে গ্রেনেডের সঙ্গে তুলনা করেÑযে কোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে চারপাশের মানুষকে আঘাত করতে পারে।

অন্যদিকে গাস জীবনের প্রতি এক রোমান্টিক বিদ্রোহী। সে চায় পৃথিবীতে একটি চিহ্ন রেখে যেতে। সে বিস্মৃত হতে চায় না। তার বিখ্যাত উক্তি:

ঞযব সধৎশং যঁসধহং ষবধাব ধৎব ঃড়ড় ড়ভঃবহ ংপধৎং.”

মানুষ পৃথিবীতে যে চিহ্ন রেখে যায়, তা অনেক সময় ক্ষতের মতোÑএই উপলব্ধি গাসকে আরও মানবিক করে তোলে।

উপন্যাসটির অন্যতম স্মরণীয় অংশ হলো আমস্টারডাম যাত্রা। হ্যাজেল তার প্রিয় বই অহ ওসঢ়বৎরধষ অভভষরপঃরড়হএর লেখকের সঙ্গে দেখা করতে চায়। গাস সেই স্বপ্ন পূরণ করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা আবিষ্কার করে, বিখ্যাত লেখক ভ্যান হাউটেন বাস্তবে একজন ভেঙে পড়া, তিক্ত মানুষ। এই অংশে জন গ্রিন দেখিয়েছেনমানুষ যাদের পূজা করে, বাস্তবে তারা অনেক সময় অসম্পূর্ণ, আহত এবং বিভ্রান্ত।

তবে আমস্টারডামে তাদের প্রেম যেন নতুন মাত্রা পায়। অ্যান ফ্রাঙ্ক হাউসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হ্যাজেল গাসের চুম্বনের দৃশ্যটি উপন্যাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। জন গ্রিন নিজেই বলেছেন, তিনি এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন কারণ এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, মৃত্যু এবং জীবনের আকাক্সক্ষার প্রতীক। 

উপন্যাসটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ আসে শেষদিকে, যখন জানা যায় গাসের ক্যানসার ফিরে এসেছে। এবার মৃত্যু হ্যাজেলের নয়, গাসের দিকে এগিয়ে আসছে। এখানেই উপন্যাসটি সাধারণক্যানসার রোম্যান্সথেকে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।

হ্যাজেলের সেই বিখ্যাত উক্তি

ঝড়সব রহভরহরঃরবং ধৎব নরমমবৎ ঃযধহ ড়ঃযবৎ রহভরহরঃরবং.”

অর্থাৎ কিছু অসীম অন্য অসীমের চেয়েও বড়।

তাদের ভালোবাসা দীর্ঘ নয়, কিন্তু গভীর। তারাচিরকালপায়নি, কিন্তু পেয়েছেএকটি ছোট অসীম’—যা তাদের কাছে পুরো পৃথিবীর সমান মূল্যবান।

জন গ্রিনের লেখনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর ভাষার সরলতা। তিনি দার্শনিক প্রশ্নও এমনভাবে লেখেন, যেন তা বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের মতো সহজ মনে হয়। তাঁর চরিত্রগুলো কৃত্রিম নয়; তারা বুদ্ধিমান, রসিক, ভীত, প্রেমময়Ñএকেবারে বাস্তব মানুষ।

জন গ্রিন ১৯৭৭ সালে ইন্ডিয়ানাপোলিস, ইন্ডিয়ানায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখক বটে, তার পাশাপাশি একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার শিক্ষামূলক কনটেন্ট নির্মাতাও। সাহিত্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টার্স লেখার পেছনে একটি বাস্তব অনুপ্রেরণাও ছিল। ক্যানসারে আক্রান্ত কিশোরী এসথার আর্লের সঙ্গে জন গ্রিনের পরিচয় হয়েছিল, এবং তার জীবনসংগ্রাম লেখককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যদিও হ্যাজেল সরাসরি এসথারের জীবনের প্রতিরূপ নয়, তবু তার মানবিক শক্তি এই উপন্যাসের আবেগকে নির্মাণ করেছে। 

উপন্যাসটির শিরোনাম নেওয়া হয়েছে শেক্সপিয়রের ঔঁষরঁং ঈধবংধৎ নাটক থেকে—‘ঞযব ভধঁষঃ, ফবধৎ ইৎঁঃঁং, রং হড়ঃ রহ ড়ঁৎ ংঃধৎংৃ কিন্তু জন গ্রিন এই শিরোনামকে নতুন অর্থ দিয়েছেন। এখানেংঃধৎংশুধু ভাগ্য নয়; মানুষের সীমাবদ্ধ জীবন, অসুস্থতা এবং অনিবার্য মৃত্যুর প্রতীক।

ইন্ডিয়ানা স্টেটের সাধারণ নগরজীবন, হাসপাতালের করিডোর, কিশোর প্রেম, বইপড়া, ভয়, হাসি এবং মৃত্যুর ছায়াÑসব মিলিয়ে ঞযব ঋধঁষঃ রহ ঙঁৎ ঝঃধৎং আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যের বিখ্যাত উপন্যাস হয়ে উঠেছে।

এই বই পড়ে পাঠক কেবল কাঁদে না; সে জীবনের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখে। কারণ জন গ্রিন শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেনÑজীবনের দৈর্ঘ্য নয়, গভীরতাই আসল।

উপন্যাসটি তরুণ পাঠকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় হলেও এর আবেগ দার্শনিকতা সব বয়সের পাঠককে স্পর্শ করে। বইটি পরে একই নামে চলচ্চিত্র হিসেবেও নির্মিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

Related Posts