নিউজার্সিতে শুরু হলো সাউথ এশিয়ান থিয়েটার উৎসব
ফারুক আজমঃ নিউজার্সিতে ২১তম সাউথ এশিয়ান থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল শুরু হল ১৩ জুন কো ল্যাব আর্টসের সঙ্গে যৌথভাবে। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে কোল্যব আর্টসের নবনির্মিত কমিউনিটি অডিটোরিয়ামে যৌথভাবে হল যাত্রা শুরু। এ বছরের ফেস্টিভ্যাল চলবে দুই উইকেন্ড ব্যাপি। শেষ হবে ২১ জুন রবিবার।
সাউথ এশিয়ান থিয়েটার ফেস্টিভ্যালের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং কর্ণধার দীপন রায় তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, থিয়েটার এখন নতুন ধারায় ছুটছে। স্থানীয় ওভারলুক হাসপাতালের সঙ্গে নিউজার্সি থিয়েটার এলায়ন্সের সদস্য এপিক এ্যক্টরস ওয়ার্কশপ এবং ভিভিড স্টেজ থিয়েটার সম্মিলিত ভাবে থিয়েটার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মিলন ঘটিয়েছে।
এবার কলকাতা থেকে এসেছেন স্বনামধন্য নাট্যব্যক্তিত্ব মেঘনাদ ভট্টাচার্য এবং অবন্তি চক্রবর্তী। ঢাকা থেকে মামুনুর রশিদের আসার কথা ছিল। তিনি আসতে পারেননি।
প্রথম দিন ১৩ জুন কোল্যবের পরিবেশনায় ছিল ইংরেজি নাটক ‘হার্ট বাস্টর্’ এবং স্পট লাইট কলম্বাসের পরিবেশনায় নাটক ‘আত্মজন’ (নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, নাট্যনির্দেশক মেঘনাদ ভট্টাচার্য)।
দ্বিতীয় দিন ১৪ জুন রবিবার উৎসব শুরু হয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যনির্দেশক মহেশ দওানির নির্দেশনায় হিন্দি নাটক হুইসপার্স অব আ বানিঢান ট্রি মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। বারোজন অভিনেতা নিয়ে মঞ্চ জুড়ে এক বৃহৎ ক্যানভাসে নানা রকম কোরিওগ্রাফি, অভিনয়ের বৈচিত্র্য, আলো এবং শব্দের সুসামঞ্জস্য সমস্ত পরিবেশকে মোহিত কেও রেখেছিল এক বিশাল কাব্যময়তায়। এর মধ্যে বলা হচ্ছে একেকটি লোক কাহিনী। দর্শকদের নিয়ে যাচ্ছে তাদের বাল্যকালে শোনা রুপকথার দেশে। একজন দক্ষ পরিচালক পারেন কী করে সেই সময়ের সেই কালকে উপস্থাপন করতে বচনে বসনে এবং অভিনয়ে। সে জন্য জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নির্দেশকের কাজ হয়ে ওঠে অনন্য।
পরের নাটকটি ছিল প্রতিথযশা নাট্যকার, অভিনেতা নির্দেশক মামুনুর রশিদ রচিত ‘অমানুষ’। দুটি চরিত্রের নাটক। নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন জান্নাতুল টুম্পা। তিনি বলেন, মঞ্চে এটি তাঁর প্রথম নির্দেশনা। নাটকটিতে দেখতে পাই একজন শিক্ষকের সব কিছু ছেড়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে স্বেচ্ছা বন্দীত্ব। তিনি বাইরে যান না, বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলেন না, নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। তিনি শিশুদের কোলাহল শোনেন। তার বিশ্বাস তিনি তার শিক্ষককে হত্যা করেছেন। সময় নিয়ে তিনি বিভ্রান্ত। তিনি ভাবেন এটা ১৯৭১।
এখানে পরিচালক এখন কোন সাল তা উহ্য রেখেছেন। দর্শক বুঝতে পারছে না নায়কের বয়স কত। তিনি যে মানসিক ব্যধিতে ভুগছেন তা তার স্ত্রী বুঝতে পেরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চান। মনে হয় তিনি পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (চঞঝউ) ভুগছেন। সঙ্গে সাইকোসিস। প্রচন্ড আঘাতের পর দেখা দেয়। যেমন ভিয়েতনামে যুদ্ধ করা মার্কিন সৈন্যদের মধ্যে ছিল। এখানে তার আঘাতের উৎস কী? আভাসে ডায়লগে ইঙ্গিত আছে ১৯৭১ এর যুদ্ধ। নায়ক বলে সেই নয় মাস লুকিয়ে ছিল। তাঁর সংলাপে বেরিয়ে আসে তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। সে আঘাত তাকে হিরোশিমা নাগাসাকির ভয়াবহতায় নিয়ে যায়। দেখতে পায় প্রত্যেকে মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে হন্তারক। সে সব কিছুর সর্বপ্রধানকে খুন করতে চায়। সেই সঙ্গে বিনাশ করবে সব অশান্তির মূল।
নাটকের স্ক্রিপ্ট শক্তিশালী। অভিনয়ের ক্ষেত্র ছিল প্রচুর। তার সদ্ব্যহার করেছেন অভিনেতা হীরা চৌধুরী। তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছে একজন হতাশাগ্রস্থ, ক্রুদ্ধ, মানসিক বিকারগ্রস্ত অসহায় মানুষের ব্যর্থ হুংকার। দারুণ অভিনয় করেছেন।
নারী চরিত্রে মিতালী দাস চমৎকারভাবে ফুটিয়েছেন তাঁর হতাশা, আতঙ্ক এবং ভালোবাসা। তিনি এখানে সফল অভিনেতা।
নাটকে চরিত্র ছিল নামহীন, তারা কেবল স্বামী এবং স্ত্রী। নাট্যকার তাদের কোনো নির্দিষ্টতায় সীমাবদ্ধ করতে চাননি। সংগীত সংযোজন যথাযথ। আলোর ব্যাপারে আরেকটু মনোযোগ দরকার ছিল। প্রথম নাটকের নির্দেশক হিসাবে জান্নাতুল টুম্পা একজন সম্ভাবনাময়ী পরিচালক হিসেবে গণ্য হবেন।
সামগ্রিকভাবে নাটকটি হয়েছে দর্শক নন্দিত। পরিচালক কোথাও কোথাও একটু ছিমছাম করতে পারতেন। নায়কের মানসিক রোগ অনুযায়ী তার মুভমেন্ট চরিত্রানুগ করতে পারতেন হয়ত।
দুই নাটকের মধ্যে ছিল শুভাশীষ পরিচালিত নতুন প্রজন্মদের নিয়ে নিরীক্ষামূলক নাটক ‘থিয়েটার ইন লাইফ’।
এবার ফেস্টিভ্যাল দুইটি উইকেন্ড জুড়ে হচ্ছে। পরের নাটকগুলো হবে জুন ২০ ও ২১।
সাউথ এশিয়ান থিয়েটারের প্রধান দীপন রায় গত বিশ বছর যাবত এই ফেস্টিভ্যাল আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাতে এনেছেন ভিন্ন মাত্রা, করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দলের সংযুক্তি। দুইজন বাংলাদেশী গোলাম সরওয়ার হারুন এবং ফারুক আজম সাউথ এশিয়ান থিয়েটার ফ্যস্টিভ্যালের কোর কমিটিতে যুক্ত।
—নিউজার্সি, ৬.১৯.২৬
