আন্তর্জাতিক আবহে হয়ে গেল নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্টফিল্ম ফেস্ট

নিউইয়র্কঃ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী অতিথিদের অংশগ্রহণে নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলনিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’—এর প্রথম আসর। গত আগস্ট, শনিবার কুইন্সের দুটি ভেন্যুতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রামাণ্যচিত্রের এই উৎসব।

এবারের উৎসবে ৩৮টি দেশ থেকে ২৮২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রামাণ্যচিত্র জমা পড়ে। দীর্ঘ বাছাই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে সেখান থেকে নির্বাচিত ৩০টি চলচ্চিত্র উৎসবের দুই ভেন্যুতে প্রদর্শিত হয়। ১১টি বিভাগে পুরস্কারের পাশাপাশি একটি বিশেষ পুরস্কারসহ মোট ১২টি পুরস্কার দেওয়া হয়।

বিভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ উৎসবকে আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত করে। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিও পুরো আয়োজনে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।

এবারের উৎসবে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইধহধহধ ঞৎরধহমষব ঝরী। চলচ্চিত্রটির পরিচালক মার্ক . ক্র্যান্ডাল।

সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইধপশ ঃড় ঙহবজবঃঁৎহ ঃড় এৎড়ঁহফ তবৎড়, পরিচালক সিলভেস্টার পি. লুকাসিয়েভিচ।

ফ্রান্সের স্তেফান মার্তিনে তাঁর ইজটঝঐঝঞজঙকঊ (টঘ ঈঙটচ উঊ চওঘঈঊঅট) শর্টফিল্মের জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মার্জ ক্লেইনম্যান ঝঃড়ড়ঢ় ঈযধঃ রিঃয অষবধঃযবধ অৎরধস শর্টফিল্মের জন্য পেয়েছেন সেরা পরিচালকপ্রামাণ্যচিত্র পুরস্কার।

ব্রাজিলের সান্তিয়াগো হোসে আসেফ পরিচালিত খবধৎহবফ ঃড় ঈৎু পেয়েছে সেরা চিত্রগ্রহণের পুরস্কার। বাংলাদেশের রাহাতুদ জামান পরিচালিত গধুনব, ঞযধঃ ডযুৃ পেয়েছে সেরা সম্পাদনা এবং চীনের গুওজং লু পরিচালিত ঝঢ়ৎরহম রহ ইড়ঃঃষব পেয়েছে সেরা পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র পুরস্কার।

তুরস্কের জিন আতাশ পরিচালিত ঘবসবংরং পেয়েছে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার। ভারতের অরুণা আর্য গুপ্তা পরিচালিত ঙহব জঁঢ়বব ঝশু পেয়েছে সেরা সামাজিক প্রভাববিষয়ক চলচ্চিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের পলি রবিনোভিৎজ পরিচালিত ডযধঃ খড়াব ডড়ৎঃয পেয়েছে সেরা শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র পুরস্কার।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডাম বালজেভিচ পরিচালিত ঞযব জবফ খবঃঃবৎ পেয়েছে সেরা অপেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা পুরস্কার। আর বিশেষ ফেস্টিভ্যাল স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঝেংদি লি খ্রিস্টিনা অরলেটস্কা পরিচালিত ওহ ণড়ঁৎ ঝযড়বং। স্কুল বুলিইং এবং সচেতনতা বিষয়ক চমৎকার এই ফিল্মটি নির্মাণ এতে অভিনয় করেছেন ব্রুকলীনের মিডউড হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা। 

ব্রাজিল, তুরস্ক, ফ্রান্স চীনের পুরস্কারজয়ীরা সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও উৎসবের জন্য শুভেচ্ছা পাঠান। অন্য বিজয়ী এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ট্রফি সনদ গ্রহণ করেন। নিউইয়র্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেট থেকে বিজয়ী চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ভারত বাংলাদেশের পুরস্কারজয়ীদের উপস্থিতিও উৎসবের আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

সেরা অপেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা পুরস্কারজয়ী ঞযব জবফ খবঃঃবৎএর পরিচালক অ্যাডাম বালজেভিচের পরিবর্তে চলচ্চিত্রটির অভিনেতা জ্যাক গাসকি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন।

কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রথম সেশন 

দিনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় সকালে কুইন্স সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে। সকালের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রযোজক সুশ্বনা চৌধুরী।

স্বাগত পরিচিতি পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬এর ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর শামীম আল আমিন এবং কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি সেন্ট্রালের প্রোগ্রামিং অ্যান্ড আউটরিচ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক চিত্রা দেওদাত। উৎসব আয়োজনে সহযোগিতার স্বীকৃতি কৃতজ্ঞতা হিসেবে কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির চিত্রা দেওদাতের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন শামীম আল আমিন।

এরপর শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। সকালের অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের ১৮টি নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনীতে উপস্থিত কয়েকজন নির্মাতা তাঁদের চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করেন।

প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দেন উৎসবের ইভেন্ট কোঅর্ডিনেটর ইশতিয়াক আহমেদ।

জেক্যালে সমাপনী পুরস্কার বিতরণ 

উৎসবের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয় বিকেল ৪টায় জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং (জেক্যাল) মিলনায়তনে। শুরুতেই ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতা, অতিথি দর্শকদের অংশগ্রহণেমিট অ্যান্ড গ্রিটপর্ব।

এই পর্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রেড কার্পেট আয়োজন। বিভিন্ন দেশ ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, অতিথি এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জেক্যালের লবি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। পারস্পরিক পরিচয়, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ছবি তোলার মধ্য দিয়ে উৎসবের এই পর্বটি চলচ্চিত্র নির্মাতা অতিথিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউইয়র্ক গ্লোবাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টের প্রথম আসরটি আমেরিকাকে উৎসর্গ করা হয়। এবারের উৎসবের থিম কান্ট্রি ছিল আমেরিকা।

মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত একটি বিশেষ ভিডিওচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর পরিবেশিত হয়নিউইয়র্ক, নিউইয়র্ক দ্য সিটি নেভার স্লিপফ্রাঙ্ক সিনাত্রার জনপ্রিয় পাওয়া গানটি। অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন আলভান চৌধুরী।

পুরস্কারজয়ী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জেনিফার রামপারসাদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন শামীম আল আমিন। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন উৎসবের আহ্বায়ক এবং ডায়াসপোরা ইউএসএএর প্রতিষ্ঠাতা ডা. প্রতাপ দাস।

২০২৬ সালের আট সদস্যের জুরি বোর্ডের প্রধান, খ্যাতিমান আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা ফাইন আর্ট ফটোগ্রাফার লিয়ার লেভিন অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শুভেচ্ছা তুলে ধরা হয়।

আরও বক্তব্য দেন উৎসবের লিড ফেস্টিভ্যাল কোঅর্ডিনেটর এবং ডায়াসপোরা ইউএসএএর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আলম।

এই অধিবেশনে পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্রসহ আরও ১২টি নির্বাচিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁদের প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রফি সনদ তুলে দেওয়া হয়।

পুরস্কার সনদ তুলে দেন চিত্রনাট্যকার ক্রিস মুর, ফেস্টিভ্যাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশরাফুন নাহার লিউজা, ডিরেক্টর শামীম আল আমিন, শিক্ষাবিদ সমাজসেবা পেশাজীবী ফিলিপ এস্তানিসলাস, ফেস্টিভ্যাল আহ্বায়ক ডা. প্রতাপ দাস, কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের নির্বাহী পরিচালক কাথা ক্যাটো, কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ডোনাল্ড প্রেস্টন ক্যাটো, অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো) এর নির্বাহী পরিচালক রুবাইয়া রহমান, সিপিএ সারোয়ার চৌধুরী, সাপ্তাহিক বাঙালীর সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী তাজুল ইমাম, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব আতিয়া সীমা, ডায়াসপোরা ইউএসএএর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আলম এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা কিথ পাওয়েল।

অটিজম সচেতনতায় বিশেষ পর্ব

অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্ব সঞ্চালনা করেন শারমিন মুনমুন। এই পর্বে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি অটিজম সচেতনতা নিয়ে একটি বিশেষ আয়োজন রাখা হয়। অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো)—এর উদ্যোগে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নির্মিত একটি পাপেট কার্টুন সিরিজের একটি পর্ব অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়। অটিজম সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বার্তা ছিল এই বিশেষ পরিবেশনায়।

প্রদর্শনীর পর আসোএর নির্বাহী পরিচালক রুবাইয়া রহমান অটিজম সচেতনতার গুরুত্ব এবং সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

আয়োজক, অংশীদার পৃষ্ঠপোষক

আন্তর্জাতিক এই চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্ক ফিল্ম ফাউন্ডেশন। উৎসবের অন্যতম অংশীদার ছিল ডায়াসপোরা ইউএসএ। এছাড়া অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল ফিল্মফ্রিওয়ে, কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি, অটিজম সোসাইটি হ্যাবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (আসো) এবং ওয়ান ওয়ান অর্গানাইজেশন। উৎসবের পৃষ্ঠপোষক ছিল ট্রুমেড ফার্মা, স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেস, বিএ এক্সপ্রেস এবং সিপিএ সারোয়ার চৌধুরী। উৎসবের কারিগরি অংশীদার ছিল থ্রিএম স্টুডিও এবং ক্রিয়েটিভ পার্টনার ছিল দ্য লেন্স নিউইয়র্ক। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির।

Related Posts