হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে

অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনঃ দাঁড়ানো, হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় আমাদের দেহের পুরো ভার বহন করে হাঁটু। পায়ের শক্তিশালী পেশিগুলো সংযুক্ত থাকে হাঁটুর সঙ্গে। এই অস্থিসন্ধিকে শক্তপোক্ত করার কাজ বেশ কয়েকটি লিগামেন্টের। এর মধ্যে শক্তিশালী লিগামেন্ট এসিএল। ঊরুর হাড় (ফিমার) এবং পায়ের নিচের হাড় বা টিবিয়াকে সংযুক্ত রাখে এটি। হাঁটুর সব চাপ এটি বহন করে। তাই হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরড হলে সাধারণত এসিএল ইনজুরির ঘটনা ঘটে। তবে মাল্টিলিগামেন্ট ইনজুরি বা পিসিএল লিগামেন্ট ইনজুরিও দেখা যায় অনেকের। 

কিভাবে হয়

হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরি অনেক কারণে হতে পারে। তবে ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতো দ্রুতগতির যে কোনো খেলার সময় ঘটা দুর্ঘটনা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় এ ধরনের ইনজুরি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। যেমন—

● খেলার সময় বা দ্রুতগতিতে দৌড়ানোর সময় হঠাৎ থেমে যাওয়া বা পিছলে পড়ে যাওয়া।

● দ্রুতগতিতে দৌড়ানোর সময় হঠাৎ করে দিক পরিবর্তন করা।

● উঁচু স্থান থেকে লাফ দেওয়া বা উঁচু স্থান থেকে নামার সময় হাঁটুতে অযাচিত চাপ পড়লে।

● অতিরিক্ত ধীরগতিতে দৌড়ানো।

● দুর্ঘটনায় হাঁটুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া।

এসিএল ইনজুরি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে খেলোয়াড়দের।

বেকায়দায় মাটির সঙ্গে হাঁটু আটকে গিয়ে যদি উল্টো দিকের চাপে সেটি দিক পরিবর্তন করে, তখনই হয় এ ধরনের ইনজুরি। তবে সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায়ও হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরড হয়।

উপসর্গ

এসিএল ইনজুরিতে যেসব লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যায়, এর মধ্যে আছে—

● ইনজুরির সময় হাঁটু থেকে জোরে ‘কট’ করে শব্দ হওয়া বা হাঁটুতে ‘কটকট’ করার অনুভূতি।

● তাৎক্ষণিক তীব্র ব্যথা এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।

● ইনজুরির কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁটু ফুলে যাওয়া।

● দাঁড়িয়ে দেহের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পারা।

● হাঁটু পুরোপুরি বাঁকানো বা সোজা করতে সমস্যা হওয়া ইত্যাদি।

এসিএল ইনজুরি হয়েছে কি না, সেটি জানার জন্য চিকিৎসক বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করে থাকেন। তিনি প্রথমেই জানতে চাইবেন কিভাবে হাঁটুর ইনজুরি হয়েছে। ইনজুরির কারণে ব্যথাযুক্ত হাঁটুর কার্যক্রমে কোনো ভিন্নতা; যেমন—নড়াচড়ায় সমস্যা বা শব্দ আছে কি না সেটা বোঝার জন্য উভয় হাঁটু পরীক্ষা করবেন। প্রয়োজন হলে এক্স—রে, এমআরআই বা আলট্রাসাউন্ড, আর্থ্রোস্কপি ইত্যাদি পরীক্ষা—নিরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

চিকিৎসা

ইনজুরির মাত্রার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরণ। সাধারণত স্পোর্টস মেডিসিন স্পেশালিস্ট অথবা বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক চিকিৎসকরা এর চিকিৎসা করে থাকেন। এসিএল ইনজুরির চিকিৎসা দুই ধরনের—একটি হচ্ছে কনজারভেটিভ, আরেকটি অপারেটিভ বা শল্যচিকিৎসা।

প্রাথমিক চিকিৎসা : যদি ইনজুরি সামান্য হয় অর্থাৎ লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়নি বা আঘাতের মাত্রা খুব বেশি নয়, সে ক্ষেত্রে হাঁটুর ওপর বরফ দেওয়া, পা উঁচু করে রাখা এবং কিছুদিন বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ধরনের চিকিৎসাকে বলা হয় রেস্ট, আইস, কমপ্রেশন অ্যান্ড এলেভেশন বা সংক্ষেপে রাইস প্রোটোকল। ব্যথা ও ফোলা কমানোর জন্য অ্যান্টি—ইনফ্লেমেটরি ওষুধ কার্যকর হতে পারে। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করতে হবে।

নিরাপত্তামূলক বেল্ট : অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হাঁটুর ওপর বাড়তি চাপ কমানো জরুরি হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে হাঁটুকে বাড়তি সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ ধরনের ব্রেস পরা যেতে পারে। বিশেষ করে খেলার সময় এটি ব্যবহার করলে হাঁটু স্থিতিশীল থাকে, নতুন করে ইনজুরড হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

ফিজিওথেরাপি : হাঁটুর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে সপ্তাহে কয়েকবার ফিজিওথেরাপি দিতে হয়। থেরাপি সেশনগুলোতে হাঁটুর চারপাশের পেশি শক্তিশালী করার জন্য রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করানো হয়। এর মাধ্যমে হাঁটুর নড়াচড়ার স্বাভাবিকতা ধীরে ধীরে ফিরে আসে। অনেক সময় বাসায় কিছু ব্যায়াম করারও পরামর্শ দেওয়া হয়।

কখন সার্জারি দরকার

যদি এসিএল সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যায়, হাঁটুর নড়াচড়ায় স্থিরতা না থাকে বা হাঁটু সহজেই বেঁকে যায়, সেসব ক্ষেত্রে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। এই অপারেশনের নাম ‘আর্থোস্কপিক এসিএল রিকনস্ট্রাকশন’। বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে, যাঁদের ভবিষ্যতে আর খেলাধুলা করার সম্ভাবনা নেই, তাঁদের এসিএল ইনজুরি হলে কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন। ক্রীড়াবিদ বা তরুণদের মধ্যে এসিএল ইনজুরি হলে অথবা যারা হাঁটুর সর্বোচ্চ ব্যবহার ফিরে পেতে চায় দ্রুত, তাদের জন্য সার্জারির বিকল্প নেই। কারণ ইনজুরড লিগামেন্ট নিজে নিজে জোড়া লাগে না, চিকিৎসকের সেটি আলাদা করে জোড়া দিতে হয়। এর সঙ্গে যদি অন্য কোনো ইনজুরি থাকে, তাহলে যেকোনো বয়সেই অপারেশন করা যায়।

এসিএল রিকনস্ট্রাকশন সার্জারির জন্য এখন বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে এই চিকিৎসা সফলভাবে হচ্ছে এবং প্রায় ৯৭ শতাংশ রোগী পরিপূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠছে। তবে অপারেশনের আগে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, যেন অপারেশন থিয়েটার জীবাণুমুক্ত হয় এবং ওই চিকিৎসক যেন অভিজ্ঞ ও দক্ষ হন। বিশেষ কারণ ছাড়া এসিএল সার্জারিতে ফাইবারটেপ ব্যবহার করার কোনো দরকার নেই।

প্রতিরোধে করণীয়

সতর্ক থাকলে এসিএল ইনজুরির ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। এ জন্য কিছু করণীয় হলো—

● নিয়মিত হাঁটুর শক্তি ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর ব্যায়াম করুন।

● খেলাধুলা বা শারীরিক কার্যক্রমের সময় সঠিক কৌশল অনুসরণ করুন।

● উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলার সময় হাঁটু রক্ষাকারী গিয়ার ব্যবহার করুন।

● খেলাধুলার সময় পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

● খেলা বা কসরতের আগে দেহকে ওয়ার্ম আপ করে নিন।

● দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে সদা সতর্ক থাকুন।

Related Posts