আর্জেন্টিনা বনাম মিশরঃ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে কী বলা হচ্ছে?

স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের মোস্তফা জিকোর বাতিল হওয়া গোল নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করছেন অনেক সাবেক রেফারি বিশ্লেষক। তবে একই সঙ্গে তারা স্পষ্টভাবে বলছেন, আর্জেন্টিনাকে জেতানোর জন্য কোনো ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোলে পিছিয়ে থেকেও ব্যবধানে জয় পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। ম্যাচ শেষে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে তারানীরব থাকতে পারে না 

কী ঘটেছিল?

বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের ৫৮ মিনিটে। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ বাম দিক দিয়ে আক্রমণে উঠেছিলেন। মিশরের মারওয়ান আতিয়া মোহামেদ হানির চাপে পড়ে তিনি বলের নিয়ন্ত্রণ হারান। সেই মুহূর্তের প্রায় ১৭ সেকেন্ড পর মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠান।
ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরে প্রথমে গোলের সিদ্ধান্ত দিলেও, ভিএআর রিভিউয়ের পর সেটি বাতিল করা হয়। ভিএআরের দায়িত্বে থাকা জেরোম ব্রিসার্ড আক্রমণের সূচনা (অঃঃধপশরহম চড়ংংবংংরড়হ চযধংবঅচচ) নির্ধারণ করেন সেই মুহূর্ত থেকে, যখন মার্তিনেজ বল হারান।

ভিএআরের ব্যাখ্যা বিতর্ক

ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী, গোলের আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার পুরো ধাপ পরীক্ষা করা হয়। তবে ঠিক কোন মুহূর্ত থেকে সেই আক্রমণ শুরু হয়েছে, তা সব সময় স্পষ্ট নয়। সময় বা দূরত্বের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। 

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিসার্ডের সিদ্ধান্ত যুক্তিসংগত হলেও সেটিই একমাত্র ব্যাখ্যা ছিল না। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময় আক্রমণের সূচনা আরও পরের মুহূর্ত থেকে ধরা হয়।

আতিয়ার পায়ের সংস্পর্শ কি ফাউল ছিল?

বিতর্কের মূল বিষয় ছিল মারওয়ান আতিয়ার পা লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পড়া। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো খেলোয়াড়ের পায়ের ওপর পা পড়লেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাউল হয় না। এই ঘটনায় আতিয়া স্বাভাবিক গতিতে প্রতিপক্ষের পাশে দৌড়াচ্ছিলেন এবং সরাসরি বলের জন্য ট্যাকল করেননি। অন্যদিকে মার্তিনেজও ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্বাভাবিকভাবেই পা ফেলেছিলেন।

ফলে দুজনের পায়ের সংস্পর্শকে স্বাভাবিক শারীরিক সংঘর্ষ (ঘড়ৎসধষ ঈড়হঃধপঃ) হিসেবে দেখা উচিত ছিল। ধরনের ঘটনা প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই ঘটে থাকে এবং সাধারণত ফাউল হিসেবে গণ্য করা হয় না। 

আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা

গত মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চেলসির বিপক্ষে ফুলহামের একটি গোল একই ধরনের ঘটনায় বাতিল হয়েছিল। ফুলহামের রদ্রিগো মুনিজ অনিচ্ছাকৃতভাবে ট্রেভোহ চালোবার পায়ে পা দিয়ে বলের দখল নেন, এরপর আক্রমণ থেকে গোল আসে।

পরে ইংল্যান্ডের রেফারিং প্রধান হাওয়ার্ড ওয়েবও সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, ওই ঘটনা এবং মিশরআর্জেন্টিনা ম্যাচদুটিই দেখিয়েছে যে ভিএআর কখনো কখনো অতিরিক্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে এমন ফাউল খুঁজে বের করছে, যা বাস্তবে ফাউল নয়।

আরেকটি নজর এড়ানো সিদ্ধান্ত

গোল করার পর জার্সি খুলে উদযাপন করেছিলেন মোস্তফা জিকো। ফুটবল আইনে এটি হলুদ কার্ডযোগ্য অপরাধ। যদিও পরে গোলটি বাতিল হওয়ায় রেফারি লেতেক্সিয়ে তাকে কোনো কার্ড দেখাননি।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি ছিল বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে রেফারিই সমালোচিত হতে পারতেন।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে কী বলা হচ্ছে

ম্যাচ শেষে মিশরের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করেন, ফিফা নাকি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে চায় এবং লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেওয়ার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

তাদের বক্তব্য, বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনকারী রেফারিরা প্রতিদিন ম্যাচের ভিডিও বিশ্লেষণ করেন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং সর্বোচ্চ মান ধরে রাখার চেষ্টা করেন। শারীরিক মানসিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত রাখতেও তারা কঠোর পরিশ্রম করেন। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচের ফল নির্ধারণ করতে তারা মাঠে নামেনএমন ধারণা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

ভুল হতে পারে, কিন্তু সেটি ষড়যন্ত্র নয়

বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ পর্যায়ের রেফারিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা। ভুল অবশ্যই হয় এবং কখনো সেই ভুল বড় দল বা শক্তিশালী দেশের পক্ষে যায়। তবে একই বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড (ব্রাজিলের বিপক্ষে), সেনেগাল (ফ্রান্সের বিপক্ষে) এবং প্যারাগুয়ে (জার্মানির বিপক্ষে) বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধাও পেয়েছে।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও প্রায় প্রতিটি দলই মনে করে রেফারিদের ভুলের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলাও একাধিকবার রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদিও ওই সময়েই সিটি সাত মৌসুমের মধ্যে ছয়বার লিগ শিরোপা জেতে। 

সবকিছু বিবেচনায় বিশ্লেষকদের মতামত, মিশরের গোলটি বাতিল করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং গোলটি বহাল থাকা উচিত ছিল। তবে সেই ভুলকে কেন্দ্র করে বিশ্বকাপের ফল নির্ধারণে কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। রেফারিরা ভুল করতে পারেন, কিন্তু তারা সচেতনভাবেই ম্যাচের ফল বদলে দেনএমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিতর্কিত ৩টি সিদ্ধান্ত কলিনার যুক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা

মিশরের আপত্তির মূল জায়গা ছিল ম্যাচের শেষভাগের তিনটি ঘটনা। কলিনা একে একে সবকটি ঘটনার রেফারিদের নেওয়া সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন:

. জিকোর গোল বাতিল: জিকো গোল করে ব্যবধান করার আগেই বিল্ডআপে মারোয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভিএআর দেখে সেই গোল বাতিল করা হয়। কলিনা বলেন, 'ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা গেছে আতিয়া প্রতিপক্ষের পায়ে পা দিয়ে আঘাত করেছেন। ফাউল মানে ফাউলই। রেফারি না দেখলেও ভিএআর এখানে হস্তক্ষেপ করার পূর্ণ অধিকার রাখে।'

. মোহাম্মদ সালাহ পেনাল্টি আবেদন: ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ডিবক্সে হুলিয়ান আলভারেজের চ্যালেঞ্জে সালাহ পড়ে গেলেও রেফারি পেনাল্টি দেননি। কলিনা বলেন, 'ডিফেন্ডার যদি প্রথমে বল স্পর্শ করেন এবং তারপর সাধারণ ফুটবলীয় সংঘর্ষ হয়, তবে তা ফাউল নয়। রেফারি এবং ভিএআর প্যানেল সালাহ আলভারেজের ঘটনাটিকে সাধারণ ফুটবলীয় কন্টাক্ট হিসেবেই সঠিক বিবেচনা করেছেন।'

. এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল: অতিরিক্ত সময়ে এনজোর করা জয়সূচক গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে মিশরের হামদি ফাথিকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার টেনে ধরেছিলেন বলে দাবি করে মিশর। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যান এবং সেই আক্রমণ থেকেই গোল পায় আর্জেন্টিনা। কলিনা এই সিদ্ধান্তের পক্ষেও রেফারির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

'ফিফা প্রেসিডেন্টও রেফারিদের প্রভাবিত করতে পারেন না'

তীব্র প্রতিক্রিয়ায় কলিনা বলেন, ফুটবলে সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা চলতেই পারে, কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো স্থান নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরণের অপবাদ মাঠের কর্মকর্তাদের এবং তাদের পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নিয়ে ট্রাম্প ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর মধ্যকার আলোচনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতেও কলিনা সাফ জানিয়ে দেন, 'কেউ দাবি করতে পারে না যে ফিফার রেফারিরা কারও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন, এমনকি ফিফা সভাপতিও রেফারিদের ওপর কোনো প্রভাব খাটাতে পারেন না।'

মিশরের অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রাপ্তি স্বীকার করলেও, ফিফা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো ম্যাচ অফিসিয়ালের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অনৈতিক প্রমাণ ছাড়া মাঝটুর্নামেন্টে তাদের বহিস্কার করার কোনো নজির ফিফার ইতিহাসে নেই।

Related Posts