গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— পনেরো আধুনিকতার পরিশীলিত কণ্ঠস্বর সুবীর সেন
বাঙালির ড্রয়িংরুমে রোমান্টিকতার সংজ্ঞা যখন কেবল উচ্চকিত আর্তি কিংবা ধ্রুপদী তান—লয়ের কৌশলে বন্দি ছিল, ঠিক তখনই নিঃশব্দ বিপ্লবের মতো আবির্ভাব ঘটেছিল একটি নতুন কিন্তু অতিচেনা কণ্ঠস্বরের। পঞ্চাশের দশকের মধ্যবিত্ত সমাজ তখন এক নতুন আধুনিকতার খোঁজে উন্মুখ, যেখানে ঘরের কোণে রাখা রেডিওর কাচ—বসানো ডায়ালটি ঘুরালেই অন্ধকার ঘরটি ভরে উঠত এক অপার্থিব সমর্পণে। সুবীর সেন ছিলেন সেই পরিশীলিত যুগের এক অনন্য সুর—স্থপতি, যিনি চড়া সুরের মহড়া দিয়ে শ্রোতাকে চমকে দিতে চাননি, বরং এক নিবিড় মায়ায় শুনিয়েছেন জীবনের গোপনতম দীর্ঘশ্বাস। তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত কসমোপলিটান আভিজাত্য ছিল, যা একই সঙ্গে ইউরোপীয় মেলোডিক ব্যালাডের মতো মোলায়েম, আবার কলকাতার চেনা বিকেলের মতো আর্দ্র ও বিষণ্ণ। সুবীর সেনের সেই গাঢ় এবং অসামান্য বারীটোন গায়কী বাংলা আধুনিক গানের জগতকে এক নতুন যুগের সন্ধান দিয়েছিল, যেখানে প্রেম মানে কেবল অশ্রুপাত নয়, বরং এক শান্ত ও গভীর নান্দনিক অপেক্ষা। সুবীর সেনের জন্ম ২৪ জুলাই ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের আসামের ডিব্রুগড়ে। জীবনের শেষলগ্নে এসে এই শিল্পী ফুসফুসের মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর, ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কলকাতার এক বেসরকারি চিকিৎসালয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পার্থিব জগত থেকে তিনি বিদায় নিলেও, রেখে গেছেন সহধর্মিণী রমা সেন, কন্যা সুপ্রিয়া সেন এবং কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয়ে এক অবিনাশী সুরের স্মৃতি। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা তাঁর আপন ভাগ্নি।
ডিব্রুগড়ের কুয়াশা থেকে কলকাতার আশুতোষ কলেজ
শিল্পী সুবীর সেনের পিতা শৈলেশচন্দ্র সেন ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। মাতা লিলি সেনের কোল আলো করে আসা এই সন্তানটি শৈশব থেকেই লালিত হয়েছিলো এক সাঙ্গীতিক পরিমন্ডলে। তাঁর বাল্য ও কৈশোরের এক বড় অংশ কেটেছিল গুয়াহাটির পাহাড়—ঘেরা ও কুয়াশায় মোড়া সবুজ চাদরে। প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধ শান্ত রূপটিই হয়তো তাঁর গায়কীর ভেতর চিরকালের জন্য এক মায়াবী স্থৈর্য বুনে দিয়েছিল। গুয়াহাটি থেকেই কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাসের পর, অন্তরের গূঢ় সুর—তৃষ্ণা মেটাতে তিনি পাড়ি জমান তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কলকাতায়। ভর্তি হলেন ঐতিহ্যবাহী আশুতোষ কলেজে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমান্তরালে কলকাতার সমস্ত বিখ্যাত স্টুডিওর অন্দরমহল, রেওয়াজের নির্জন সকাল আর প্রথিতযশা গুণীদের সংগে আড্ডাই হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তাঁর প্রথাগত তালিমের ভিত গড়ে উঠেছিল আচার্য চিন্ময় লাহিড়ীর তত্ত্বাবধানে। পরবর্তীতে পন্ডিত উষারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কাছে ঠুমরির সূক্ষ¥ কারুকাজ ও তান—লয়ের যে গভীর দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন, তা তাঁর কণ্ঠকে এক আশ্চর্য নমনীয়তা দান করে। ছাত্রাবস্থায় এইচএমভি (ঐগঠ) আয়োজিত একটি মর্যাদাপূর্ণ সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় হাজারো প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সুবীর সেন প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই ঐতিহাসিক বিজয় ছিল বাংলা আধুনিক গানের আঙিনায় এক রাজকীয় কণ্ঠের আনুষ্ঠানিক প্রবেশের সূচনা। ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘কলম্বিয়া রেকর্ডস’ থেকে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যার এক দিকে ছিল ‘জীবন বাতি নিভিয়ে যেদিন’ এবং অন্য দিকে ‘আর কত জানাব তোমায়’। গীতিকার শ্যামল গুপ্তের অনন্য শব্দচয়ন এবং সুরকার চিত্ত রায়ের ধ্রুপদী সুরের মেলবন্ধনে তৈরি এই প্রথম রেকর্ডটিই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, বাংলা গানের জগতে এক নতুন এবং অত্যন্ত অভিজাত কন্ঠশিল্পীর জন্ম হতে চলেছে।
আন্তর্জাতিক ঘরানার ক্রুনিং ও সুধীন দাশগুপ্তের ক্যানভাস
সুবীর সেনকে সমকালীন অন্যান্য মহীরুহদের ভিড়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে চেনার মূল চাবিকাঠি ছিল তাঁর স্বর—তন্তুর বিশেষ বুনন। তিনি যখন গাইতেন, তখন শ্রোতা তাঁর মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো আকাশছোঁয়া প্রশান্ত বিষাদ খোঁজেনি, কিংবা মান্না দের মতো শাস্ত্রীয় তান—মন্ত্রের অগ্নিগর্ভ বিস্ফোরণও আশা করেনি। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানার এক আধুনিক কন্ঠশিল্পী।
তাঁর গায়কীতে সুদূর মার্কিন মুলুকের ন্যাট কিং কোল (ঘধঃ করহম ঈড়ষব) কিংবা জিম রিভসের (ঔরস জববাবং) মতো আন্তর্জাতিক মানের ‘মেলোডিক ক্রুনিং’ বা মখমলি মাদকতার এক প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল। কিন্তু সেই প্রতীচ্য প্রভাবকে তিনি অন্ধ অনুকরণে পর্যবসিত করেননি বরং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তাকে রূপান্তর করেছিলেন বাঙালির চিরন্তন চাঁদের আলো, কলেজ স্ট্রিটের বৃষ্টিভেজা ট্রামলাইন আর প্রথম প্রেমের অব্যক্ত বয়ানে। ফলে তাঁর গান একই সাথে ছিল কসমোপলিটান ও ঘরোয়া, আন্তর্জাতিক রুচিসম্পন্ন অথচ একান্তই নিজস্ব মাটির ঘ্রাণযুক্ত।
বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কিংবদন্তি সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের সাথে সুবীর সেনের সৃজনশীল মেলবন্ধন এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। সুধীন দাশগুপ্তের জাদুকরি সুরের ছোঁয়ায় সুবীর সেনের কণ্ঠ থেকে একে একে নিঃসৃত হয়েছিল ‘ওই উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙিন’ কিংবা ‘স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে’—এর মতো কালজয়ী গান, যা তাঁকে জনপ্রিয়তার এক সুদৃঢ় আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর যখন তিনি গাইলেন ‘এত সুর আর এত গান’, তখন মনে হলো এক মরমী শিল্পী যেন জগতের অমোঘ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নিজেরই এক অলিখিত বিদায়বার্তা বা এপিটাফ রচনা করছেন। সুরের সেই আত্মিক আর্তি শ্রোতার হৃদয়কে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিল যে, সময়ের সুদীর্ঘ ব্যবধানেও সেই সুর আজও অমলিন।
বোম্বাইয়ের রুপালি জগৎ ও এক ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যান
হিন্দি চলচ্চিত্র—সংগীতের সুবিশাল পরিমন্ডলেও সুবীর সেনের পদচারণা ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁর কণ্ঠের সেই পাশ্চাত্য ঘরানার মেলোডির জাদু টের পেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা গুরু দত্ত স্বয়ং তাঁকে বোম্বাইয়ের রুপালি জগতে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে ‘ছোটি বহেন’, ‘আস কা পঞ্ছি’, ‘রূপ কি রানি চোরোঁ কা রাজা’ এবং ‘বয় ফ্রেন্ড’—এর মতো বড় বাজেটের ছবিতে তাঁর নেপথ্য কণ্ঠ শ্রোতাকুলকে মুগ্ধ করে। সুরের সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলের সাথে তাঁর গাওয়া দ্বৈত গানগুলো আজীবন হিন্দি গানের রসিকদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
তবে সুবীর সেন কেবল নেপথ্য গায়কীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তাঁর রূপালী পর্দায় অভিনয়ের দক্ষতাও ছিল প্রশংসনীয়। বাংলা ছবি ‘মোমের আলো’—তে মহানায়ক উত্তম কুমারের সমান্তরালে অভিনেতা—গায়ক হিসেবে তাঁর পরিশীলিত উপস্থিতি এবং হিন্দি ছবি ‘অনুভব’—এ তাঁর কাজ আজও সিনেমা—গবেষকদের কৌতূহল জাগায়। চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক চমকপ্রদ তথ্য হিসেবে জানা যায়, প্রখ্যাত পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ‘অভিমান’ চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রের জন্য প্রথম প্রস্তাবটি সুবীর সেনকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো এক নিভৃত অভিমানে সুবীর সেন সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে, চরিত্রটি পরবর্তীতে অমিতাভ বচ্চনের ঝুলিতে যায় যা হিন্দি সিনেমায় এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।
রবীন্দ্রসংগীতের আধুনিক মেজাজ ও সুরের উজ্জ্বল প্রদীপ
সুবীর সেনের বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি অনন্য প্রকাশ ঘটেছিল রবীন্দ্রসংগীতে। রবীন্দ্রনাথের গানে তিনি কোনো অতিরিক্ত ভাবোচ্ছ্বাসের ঢেউ তোলেননি, বরং বজায় রেখেছিলেন এক অদ্ভুত সুশৃঙ্খল উচ্চারণশৈলী, পরিমিত গাম্ভীর্য এবং বাণীর প্রতি নৈতিক সততা। ‘আমি হেথায় থাকি শুধু’, ‘বহু যুগের ওপার হতে’ কিংবা ‘আসা—যাওয়ার পথের ধারে’—এই গানগুলোতে তিনি কবিগুরুর সৃষ্টিকে এক আধুনিক নাগরিক মেজাজে উপস্থাপন করেছিলেন, যার ফলে গানের মূল মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না হয়ে বরং এক নতুন আধুনিকতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। একজন সফল সংগীত পরিচালক হিসেবেও তাঁর মেধা ছিল ঈর্ষণীয়। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘মিস প্রিয়ম্বদা’—তে এবং ১৯৭২ সালে হিন্দি ছবি ‘মিডনাইট’—এর সুরারোপের মাধ্যমে তিনি নিজের সুরকার সত্তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। দীর্ঘ সাঙ্গীতিক সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৭ সালে ‘হারমোনিকা সঙ্গীত সম্মান’, ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘সঙ্গীত মহাসম্মান’ এবং ২০১৩ সালে রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’—এ ভূষিত হন।
সুবীর সেনের গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। এত সুর আর এত গান, ২। নয় থাকলে আরো কিছুক্ষণ, ৩। ওই উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্ন রঙিন, ৪। স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে, ৫। জীবন বাতি নিভিয়ে যেদিন, ৬। আর কত জানাব তোমায়, ৭। সারাদিন তোমায় ভেবে, ৮। চাঁদ তুমি এত আলো, ৯। আকাশ যেখানে গল্প বলে, ১০। ডাকলেই সাড়া দিতে নেই, ১১। আমি সাগর কখনো দেখিনি, ১২। ওগো কাজল নয়না, ১৩। অস্ত আকাশ যেমন করে, ১৪। শুধু সেই গানে আজি, ১৫। তোমার শিশির ভেজা, ১৬। তোমরা আমার গান শুনে আজ, ১৭। সন্ধ্যালগনে স্বপ্নমগনে, ১৮। এ যেনো সেই চোখ, ১৯। যখন হাত বাড়ালেই আকাশ, ২০। পাগল হাওয়া, ২১। ধরণীর পথে পথে ধূলি হয়ে, ২২। আর কিছু স্মরণ নেই, ২৩। তুমি বলেছিলে, ২৪। কিছুদিন পরে, ২৫। জানিনা জানিনা কোন সাগরের ঢেঊ এসে
পরিশেষ
সুবীর সেনকে শোনা মানে বাংলা আধুনিক গানের সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণকে পুনর্পাঠ করা, যখন আধুনিকতা মানে কেবল পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের কোলাহল ছিল না, ছিল এক নতুন পরিশীলিত মন, নতুন নাগরিক উচ্চারণ এবং একাকীত্বের এক মায়াবী নান্দনিকতা। তিনি বাংলা গানের অন্দরে নগরজীবনের সেই ধূসর নরম আলো আর পরিমার্জিত প্রেমের যে চিরন্তন হাহাকার বুনে দিয়েছিলেন, তা কালজয়ী এবং বাঙালির আবেগের এক শাশ্বত আশ্রয়। সুবীর সেনের গান বাঙালির সুর—চেতনার এক অনন্ত বর্তমান হয়ে চিরকাল অন্তরে স্পন্দিত হবে।
