যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ জাতিসংঘ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তার নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট প্রত্যয় নিয়ে চার্টার স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ নামক একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রাক্কালে বিশ্বজুড়ে সচেতন মানুষের মনে যে গভীর আশার সঞ্চার হয়েছিল, সম্ভবত আজ পর্যন্ত আর কোনো এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য এমনটি হয়নি। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য যে এর ৫ ও ৬ সপ্তাহের মধ্যে দুটি ভয়াবহ মানব বিধ্বংসী বোমায় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে লক্ষ লক্ষ নিরীহ—নিরাপরাধী মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সেই আশাবাদকে দুমড়ে, মুচড়ে তছনছ করে দেয়। সদ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্থলাভিষিক্ত হওয়া হ্যারি ট্রুম্যান নিশ্চয় মুচকি হেসে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তোমাদের এইসব ‘শান্তি’, ‘নিরাপত্তা’ আমরা থোরাই কেয়ার করি। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন অন্যান্য কয়েকটি দেশের নেতাদের সাথে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। বিজয়ী মোর্চা প্যারিসে বসে লীগ অব নেশন্স গঠন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তাতে যোগ দেয়নি। এমন কি প্রাথমিক পর্যায়ে যে চারটি দেশকে স্থায়ী সদস্যর মর্যাদা দেয়া হয়, সেখানেও যুক্তরাষ্ট্র ছিল না। ১৯৩৫ সালে জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করলে লীগ অব নেশন্স জাপানকে থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল। জাপান তখন স্থায়ী সদস্যদের একটি। ৪০টি দেশ জাপানের বিরুদ্ধে ভোট দিলে, জাপান ভেটো দিয়ে তা প্রতিহত করে। লীগ অব নেশন্সের পরবতীর্ ব্যর্থতা ইতালি—ইথিওপিয়ার যুদ্ধ। তার পরপরই ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হলে ব্যর্থতার লজ্জায় মুখ ঢেকে এই প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়ে।
লীগ অব নেশন্সের ব্যর্থতার পর ইউনাইটেড নেশন্স যে ভয়াবহ মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে তার পরবতীর্ ইতিহাস, জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ ছাড়াই একে একে উপনিবেশবাদের পতন। সেই সাথে একটির পর একটি যুদ্ধÑ কোরিয়ার যুদ্ধ, চীন—ভারত, ভারত—পাকিস্তান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইসরাইল—মিশর যুদ্ধ, ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ইরাক—আমেরিকা যুদ্ধ, ইরাক—ইরান যুদ্ধ, আফগানিস্তান দখল, ইরাক দখল, গাজা গুড়িয়ে দিয়ে দখল, রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান—ইসরাইল—আমেরিকা যুদ্ধ— কোনোটিই জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠান না পেরেছে রোধ করতে, না পেরেছে থামাতে। বরঞ্চ বিভিন্ন বড় দেশ যেমন সোভিয়েট ইউনিয়ন ও পরে রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জাপান, নর্থ কোরিয়া, ইসরাইল, ভারত, পাকিস্তান ক্রমাগত তৈরি করে গেছে মানব বিধ্বংসী আণবিক, পারমাণবিক, হাইড্রোজেন, ন্যাপাম, ক্লাস্টার বোমা, ড্রোন ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মত ভয়াবহ যুদ্ধাস্ত্র। জাতিসংঘ থামাতে পারেনি। মাঝে মাঝে কি কি সব স্বপ্নিল চুক্তি—টুক্তি করে বিশ্ববাসীকে ভাওতা দিয়েছে। এমন কি তারা বড় দেশগুলোর হাত থেকে ছোট প্রতিবেশীকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
ফিলিস্তিনের ৭৫ বছরেরও বেশি সময়ের সমস্যা সমাধান করা দূরের কথা এই দেশটিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিন্দনীয়। নিন্দনীয় ছিল ইরাক দখল ও আফগানিস্তান দখল নিয়েও কোনো টু শব্দটি না করা। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বৃটিশরা কাশ্মীর সমস্যা রেখে যায়। সেই সমস্যার আজো কোনো সমাধান করতে পারেনি, সমাধান করতে পারেনি দেশে দেশে এই রকম আরো অনেক সমস্যার। থামাতে পারেনি দেশে দেশে অসাংবিধানিকভাবে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল। জাতিসংঘ যেখানে বিশ্বকে নিরস্ত্র করবে, যুদ্ধহীন করবে অথবা যুদ্ধ কমিয়ে আনবে, তা হয়নি। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও লাভজনক ব্যবসার নাম অস্ত্র ব্যবসা। আর এই অস্ত্র উদ্ভাবন ও ম্যানুফ্যাংচারিং ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় নানা অজুহাতে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে অস্ত্র বেচা—কেনা হচ্ছে। এই অস্ত্র বেচা—কেনার পরবতীর্ পর্যায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে আরো অস্ত্র বিক্রি করা। যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা বা যুদ্ধ বিরতির উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিয়ে আরো আরো অস্ত্র বিক্রির অপচেষ্টা চলছে। ফলে পৃথিবীতে আজ দেশের সাথে দেশের সংঘর্ষ, দেশের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ ক্রমশ জটিল ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে উসকে দিয়ে দেশকে ভাঙার যড়যন্ত্র হচ্ছে। পৃথিবীর সাধারণ মানুষ জানে এসব কেন হচ্ছে, কারা উসকে দিচ্ছে, কারা কলকাঠি নাড়ছে, কারা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিলিয়ে দিয়ে মাথা কিনে নিচ্ছে। কেবল জাতিসংঘ দেখতে পায় না। দেখতে পেলেও টু শব্দটি করে না। তারা কোনো সমস্যার সমাধান না করে পরিস্থিতি জটিল করার জন্য কোনো কোনো দেশের ইশারায় কাজ করে। এ কারণেই কি জাতিসংঘের সৃষ্টি হয়েছিল?
জাতিসংঘের একটি অন্যতম কর্মসূচী শান্তিরক্ষী বাহিনী। তারা হয়ত আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে আংশিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু বৈশ্বিক বিশাল সংঘাত ও সংঘর্ষের সমাধানের তেমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই জাতিসংঘের। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া।
জাতিসংঘের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন বৃটেনের গ্লাডউইন জেব, তিনি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত। দ্বিতীয় সেক্রেটারি জেনারেল নরওয়ের ট্রাইগ লাই। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের ৭ বছরের মাথায় পদত্যাগ করেন। সুইডেনের ড্যাগ হেমার্সশোল্ড ৮ বছরের মাথায় মারা যান। এরপর আরো ৭ জন সেক্রেটারি জেনারেল দায়িত্ব পালন করলেও সবচেয়ে কম সময়ের জন্য এবং সবচেয়ে হুমকির মুখে দায়িত্ব পালন করেন মিশরের বুট্রোস বুট্রোস ঘালি। তিনি ছিলেন মাত্র ৪ বছর। মহাসচিব যত বিখ্যাত ব্যক্তিই হন না কেন তারা জাতিসংঘকে তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল করে তুলতে পারেনি। এমন কি কোফি আনানের মত সেক্রেটারি জেনারেলের সময় আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট জেনারেল কলিন পাওয়েল জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে যে মিথ্যাচার করেন ইরাকের মানব বিধ্বংসী ম্যাস উইপন থাকা নিয়ে, তার কথা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ফলে পৃথিবীর অজ¯্র শান্তিপ্রিয় শিক্ষিত মানুষের কাছে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠান নয়। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি। তাদের কী লাভ কী ক্ষতি তারাই বলতে পারবে প্রতি বছর সাংবাৎসরিক মিলনমেলা ছাড়া।
আমরা জাতিসংঘের বিরুদ্ধে নই। যে উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়, সেই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এই রকম প্রতিষ্ঠানের দরকার আছে। কিন্তু কাগুজে বাঘের মত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই কাজের চেয়ে অকাজের কাজী হওয়ার। এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করে গড়ে তোলার জন্য ১৯৩টি দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেখতে হবে কোনো রাষ্ট্রের ইঙ্গিতে যেন এই প্রতিষ্ঠান চুপ করে না থাকে, মিথ্যাচার না করে। তারা যেন অন্য কোনো দেশের এজেন্ডা পূরণে সহায়ক না হয়ে বিশ্বের সকল মানুষের স্বার্থে কাজ করে। এমন কি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় যেন আনা হয় (জাতিসংঘের চার্টারে যাই লেখা থাকুক না কেন)। তবে সবার আগে যেন তারা ছোট দেশগুলোর পাশে দাঁড়ায়।
