ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপÑ নব্বই মিনিটের মহাকাব্য || ড. জীবন বিশ্বাস
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুধুমাত্র একটি চর্মগোলকের লক্ষ্যভেদের প্রতিযোগিতা নয়, এ যেন খেলাধুলা, অর্থনীতি, সীমান্তনীতি এবং বিশ্বজনীনতার এক মহাদেশীয় আত্মসমীক্ষা। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার বিশাল ক্যানভাসেÑযুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আঙিনায় চলছে এই ফুটবল—মহোৎসব। পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই বৃহত্তম আসর। ৪৮টি দেশের রণসাজ, ১০৪টি ম্যাচের টানটান উত্তেজনা আর তিন দেশের ১৬টি উৎসবমুখর নগরী। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের বাঁশি ফুটবলের সোনালী স্মৃতির সাথে বর্তমানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আর ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের ফাইনাল ম্যাচটি এই নাগরিক—উৎসবের সমাপনী প্রতীক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে চিহ্নিত হবে। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
এই আয়োজনের কলেবর বিশাল, তবে এর ভেতরের দর্শন আরও গভীর ও জটিল। বিশ্বকাপ চিরকালই মানুষের সুপ্ত বৈশ্বিক আকাক্সক্ষার এক অনন্য নাট্যমঞ্চ। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের সেই প্রথম আসর থেকেই ফুটবল মানুষকে এক মানচিত্রহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়ে আসছেÑযেখানে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি না হয়েও কেবল পায়ের জাদু, পরিমিতিবোধ আর যৌথ আনন্দের শক্তিতে একটি জাতি বিশ্বজয় করতে পারে। ২০২৬ সালের এই সম্প্রসারিত বিন্যাস চিরাচরিত ফুটবল—আভিজাত্যের বাইরে থাকা প্রান্তিক দেশগুলোকেও এক আলোর বৃত্তে নিয়ে এসেছে। কেপ ভার্দে, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো নতুন সারথিরা এবার প্রথম বিশ্বকাপ মাঠের ঘাসের গন্ধ নিচ্ছে। নরওয়ে ফিরেছে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে। একদিকে লিওনেল মেসির জাদুকরী স্পর্শে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার আকুলতা, অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ষষ্ঠ বিশ্বকাপের বিদায়ী গোধূলির আলোÑসব মিলিয়ে এ এক আবেগের পারাপার। কূটনীতির ভাঙাচোরা সম্পর্কের এই রুক্ষ যুগে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ যেন এক ধরনের প্রতীকী ও শাশ্বত বৈশ্বিক নাগরিকত্বের প্রতিফলন, সৌহার্দে্যর মেলবন্ধন।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিশ্বকাপ একদিকে যেমন আত্ম—আবিষ্কারের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে এক নীরব সংশোধন।
আমেরিকান ‘সকার’ মোটেই নতুন নয়। উনিশ শতক থেকেই আমেরিকায় সংগঠিত ফুটবলের ইতিহাস বহমান। ১৯৩০ সালের প্রথম পুরুষ বিশ্বকাপেই যুক্তরাষ্ট্র সেমিফাইনালের চৌকাঠে পা রেখেছিল, আর ১৯৫০ সালে পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডকে ১—০ গোলে হারিয়ে জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের সেই বিখ্যাত ‘মিরাকল অন গ্রাস’—এর। তবে বহুকাল ধরে বেসবল, বাস্কেটবল আর আমেরিকান ফুটবলের দাপটে এই শিল্পিত খেলাটি আমেরিকায় এক প্রকার সাংস্কৃতিক নির্বাসনেই ছিল। ১৯৯৪ সালের মার্কিন বিশ্বকাপ সেই অচলায়তন ভেঙে দেয়। সেবার মাঠে ৩৫ লাখেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতি আজও এক অজেয় কীর্তি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। সেই আসরেরই প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হিসেবে ১৯৯৬ সালে জন্ম নেয় আমেরিকান মেজর লীগ সকার বা এমএলএস।
১৯৯৪ সালের সেই বীজ আজ ২০২৬ সালের মহীরুহ হয়ে উঠেছে। এমএলএস হয়তো রাতারাতি আমেরিকাকে ব্রাজিল বা জার্মানিতে রূপান্তর করতে পারেনি, কিন্তু এটি গড়ে তুলেছে আধুনিক স্টেডিয়াম, একাডেমি, নতুন খেলা দেখার অভ্যাস এবং এক বিশাল পেশাদার ফুটবল—সংস্কৃতি। আজ উত্তর আমেরিকার ফুটবল—অনুরাগীরা মোটেই কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নয়। সাম্প্রতিক নিয়েলসেন (ঘরবষংবহ) প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে উত্তর আমেরিকায় ফুটবল—ভক্তের সংখ্যা প্রায় দশ শতাংশ বেড়ে ১৩৬ মিলিয়নের কোটা ছুঁয়েছে, যার মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে ৬২.৫ মিলিয়ন অনুসারী। ২০২৬—এর এই মহাযজ্ঞ এবং পরবর্তী ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক হয়তো সকারকে চিরতরে আমেরিকান সংস্কৃতির এক স্বাভাবিক খেলার—ভাষায় পরিণত করবে।
তবুও, এই ঝকঝকে উৎসবের আড়ালে এক তীব্র টানাপোড়েন লুকিয়ে রয়েছে। একসময়ের যৌথ পূর্বাভাস ছিল, এই আয়োজন থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হবে, যা পরবর্তীকালে ১০৪ ম্যাচের সম্প্রসারণে আরও স্ফীত হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য ফিফা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বিতরণের ঘোষণাও দিয়েছে, যা এই খেলার অবিশ্বাস্য বাণিজ্যিক শক্তির প্রমাণ দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল ঐশ্বর্যের ভাগ সাধারণ ফুটবল—রোমান্টিকেরা কতটুকু পাচ্ছেন? টিকিট বিক্রির ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা চড়া বাজারদর, আকাশচুম্বী ভ্রমণব্যয়, কালোবাজারির দাপট এবং তিন দেশের বিশাল ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বহু সাধারণ মানুষ আজ গ্যালারির বাইরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। ‘মানুষের খেলা’ নামে পরিচিত এই ফুটবল কি তবে কর্পোরেট ল্যাবরেটরির কোনো মহার্ঘ বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে?
এর সাথে যুক্ত হয়েছে কঠোর সীমান্ত ও মানবতাবাদী প্রশ্ন। বিশ্বকাপ তো হওয়ার কথা ছিল এক অবাধ আগমনের উৎসব, যেখানে রেলস্টেশনে পতাকার মিছিল হবে, অচেনা মানুষ মুহূর্তেই আত্মীয় বনে যাবে এবং জনপথে ধ্বনিত হবে বহু ভাষার মিলনগীতি। অথচ টুর্নামেন্টের প্রাক্কালে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভ্রমণ—সতর্কতা এবং জাতিগত প্রোফাইলিংয়ের আশঙ্কা এই উৎসবের নৈতিক পটভূমিকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে। কোনো আয়োজক দেশ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মহৎ সংগীত গাইবে, আর নিজের সীমান্তদ্বারে অতিথিকে সন্দেহের চোখে দেখবে, এ কেমন দ্বিচারিতা?
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বকাপের অতীত সবসময় কলঙ্কমুক্ত ছিল না। এই প্রতিযোগিতা যেমন বিশ্বকে দিয়েছে ১৯৩০ সালের উরুগুয়ের সেই রোমাঞ্চ, ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল কিংবা ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মানবিক মিলনের মহাকাব্য, তেমনি এটি কখনো কখনো শাসকের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ারও হয়েছে। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বগণমাধ্যমের চোখের আড়ালে কীভাবে রাষ্ট্রীয় দমন—পীড়নের কৌশল বদলে ফেলা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্বকাপ সকারের মত মেগা—ইভেন্ট যেমন সম্প্রীতির সেতু গড়তে পারে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিংস্রতাকে আড়াল করার সুন্দর চাদর হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এই পাঠ কোনো নৈরাশ্যবাদ শেখায় না, বরং এক পরম সতর্কতার জোগান দেয়; খেলাধুলা তখনই শান্তির দূত হতে পারে, যখন আলোর ঝলকানির সাথে দায়বদ্ধতার একাত্মতা থাকে।
তবুও বিশ্বকাপ মানবসভ্যতার এক বিরল ও যৌথ ক্যালেন্ডার। জাতিসংঘ খেলাধুলার এই অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্তর্নিহিত শক্তিকে পরম শ্রদ্ধায় স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিফাও এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে ফুটবলকে এক অভিন্ন শান্তিসূত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের প্রকৃত সাফল্য কেবল কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়াম, বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব কিংবা কোনো মহাতারকার বিদায়ী অশ্রুতে মাপা যাবে না। এই উৎসব সার্থকতা পাবে তখনই, যখন কুইন্স, ডালাস, টরন্টো কিংবা ভ্যাঙ্কুভারের কোনো এক চঞ্চল শিশু এই পৃথিবীকে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র বা হুমকি না ভেবে, ভাবতে পারবে এক সবুজ মাঠের উৎসব, যেখানে থাকবে ভিন্ন রঙের পতাকা, একটিমাত্র গোলক আর নব্বই মিনিটের এক শৃঙ্খলিত সুন্দর আশা এবং আগামী দিনের ভরসা। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ তখনই সার্থক হবে, যখন এটি নিজেকে দুটি প্রবল প্রলোভন থেকেও মুক্ত রাখতে পারবেঃ প্রথমত, কেবল কর্পোরেট পুঁজির এক রূঢ় ও যান্ত্রিক উৎসবে পরিণত হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, নৈতিক দায়িত্বহীন রাজনীতির মঞ্চ হওয়া থেকে। বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এর গণতান্ত্রিক ও মানবিক আবেদনের মধ্যে। বিশ্বমানবতাকে এটি শেখাবেঃ এই খেলা কোনো দূর দেশের যাযাবর পাখি নয়, এটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের অনুশীলন। একই সঙ্গে বিশ্বকে শেখাবেÑপ্রতিযোগিতা মানেই শত্রুতা নয়। সম্প্রীতি কেবল জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঘোষিত শব্দমালা নয়, তা প্রতিফলিত হতে হবে ভিসা—উইন্ডোতে, টিকিট কাউন্টারে, ফুটপাতে এবং অচেনা কোনো ফুটবল—পথিককে দেওয়া অকৃত্রিম আন্তরিক সম্ভাষণে।
