কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প— তের কাগজের পাতায় অমর কাব্য || আখতার আহমেদ রাশা
যখন কোনো দেশ তাদের মুদ্রায় একজন কবি, লেখক বা দার্শনিকের প্রতিকৃতির পাশাপাশি তাঁদের কালজয়ী সৃষ্টির অংশবিশেষÑকবিতা, গান বা দর্শনের বাণী জুড়ে দেয়, তখন সেই মুদ্রাটি কেবল পকেটে রাখার টাকা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সেই জাতির সংস্কৃতির ধারক ও একটি ‘লিভিং মিউজিয়াম’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাহিত্যের এই নান্দনিক সুবাস যেভাবে কাগজের নোটে ছড়িয়ে আছে, তা বিস্ময়কর।
সুইডেনের বিখ্যাত ২০ ক্রোনর (কৎড়হড়ৎ) নোটটির দিকে তাকালে সাহিত্যের এক অদ্ভুত আলো এসে চোখে পড়ে। এই নোটে স্থান পেয়েছেন নোবেলজয়ী প্রথম নারী সাহিত্যিক সেলমা ল্যাগেরলফ (ঝবষসধ খধমবৎষস্খভ)। নোটটির সামনের অংশে তাঁর প্রতিকৃতির ডানপাশে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে অত্যন্ত সূক্ষ¥ মাইক্রোপ্রিন্ট অক্ষরে খোদাই করা আছে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘গোস্টা বার্লিং’স সাগা’র সেই বিখ্যাত মূল সুইডিশ পঙক্তিটি: "...সবহ ফবঃঃধ ব্ধৎ ব্ধহফভ্র ফবঃ ঁহফবৎনধৎধ, ধঃঃ সধহ ষব্ধহমঃধৎ বভঃবৎ ফবঃ ংড়স াধৎ, ড়পয ধঃঃ সধহ মৎভ্রঃবৎ স্খাবৎ ফবঃ ংড়স মভ্রঃঃ ভস্খৎষড়ৎধঃ, ড়পয ধঃঃ সধহ সরহহং." যার ইংরেজি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়— "...নঁঃ ঃযধঃ রং হবাবৎঃযবষবংং যিধঃ রং ড়িহফবৎভঁষ, ঃযধঃ ড়হব ষড়হমং ভড়ৎ যিধঃ ধিং মড়হব, ধহফ ঃযধঃ ড়হব বিবঢ়ং ড়াবৎ যিধঃ ধিং ষড়ংঃ, ধহফ ঃযধঃ ড়হব ৎবসবসনবৎং." আর বাংলায় এর অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—“...তবুও সেটাই তো চমৎকার, যে মানুষ যা চলে গেছে তার জন্য ব্যাকুল হয়, এবং যা হারিয়ে গেছে তার জন্য অশ্রুবিসর্জন করে, আর কেউ না কেউ তা মনে রাখে।” একটি দেশের মুদ্রায় মানুষের স্মৃতিকাতরতা ও যাপিত জীবনের এমন কাব্যিক জীবনবোধের উপস্থিতি নোটটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই নোটের উল্টো পিঠে তাঁর লেখা শিশুদের বিশ্ববিখ্যাত রূপকথা ‘দ্য ওয়ান্ডারফুল অ্যাডভেঞ্চারস অব নিলস’—এর সেই দৃশ্যটি রয়েছে, যেখানে নিলস একটি বুনো হাঁসের পিঠে চড়ে সুইডেনের আকাশের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে।
স্কটল্যান্ডের জাতীয় কবি রবার্ট বার্নস স্থান পেয়েছেন ক্লাইডসডেল ব্যাংকের ১০ পাউন্ড নোটে। এই নোটের ব্যাকগ্রাউন্ডে কবির বিখ্যাত রোমান্টিক কবিতা "গু খড়াব রং খরশব ধ জবফ, জবফ জড়ংব" (আমার ভালোবাসা যেন একটি লাল, টকটকে গোলাপ)—এর ক্যালিগ্রাফি করা পঙক্তিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ¥ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক ১০ পাউন্ডের নোটটি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক জেমস জয়েসের প্রতি এক অসাধারণ শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই নোটটির নান্দনিকতা সাহিত্যের ইতিহাসকে ছুঁয়ে যায়। এর সামনের অংশে জয়েসের প্রতিকৃতির ঠিক পেছনে রয়েছে তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ এর প্রথম পাতার কিছু লাইন এবং ডাবলিনের মানচিত্র। অন্যদিকে, নোটটির উল্টো পিঠের ক্যানভাসটি আরও বিস্ময়কর। সেখানে স্থান পেয়েছে জয়েসের জীবনের শেষ উপন্যাস ‘ফিনেগানস ওয়েক’ এর সেই বিখ্যাত আইকনিক উদ্বোধনী লাইন: "ৎরাবৎৎঁহ, ঢ়ধংঃ ঊাব ধহফ অফধস'ং, ভৎড়স ংবিৎাব ড়ভ ংযড়ৎব ঃড় নবহফ ড়ভ নধু, নৎরহমং ঁং নু ধ পড়সসড়ফরঁং ারপঁং ড়ভ ৎবপরৎপঁষধঃরড়হ নধপশ ঃড় ঐড়িঃয ঈধংঃষব ধহফ ঊহারৎড়হং." (নদীপ্রবাহ, ইভ এবং অ্যাডামস গির্জা পেরিয়ে, তটের বাঁক থেকে উপসাগরের মোহনা ছুঁয়ে, চক্রাকার আবর্তনের এক প্রশস্ত পথ ধরে আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে চলে হোথ দুর্গ আর তার আশপাশে..) এই গভীর রূপক লাইনের সাথে নোটটিতে আরও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল জেমস জয়েসের একটি স্বাক্ষর এবং ডাবলিনের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ‘লিফি নদী’র প্রতীকী এক পাথুরে মুখাবয়ব। একটি ব্যাংকনোটের দুই পিঠে কীভাবে আস্ত একটা সাহিত্যিক শহর এবং লেখকের জীবনদর্শনকে এঁটে দেওয়া যায়, আয়ারল্যান্ডের এই মুদ্রাটি তার এক অনন্য দলিল।
পোল্যান্ডের মুদ্রায় গভীর দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে জড়িয়ে আছেন রোমান্টিক যুগের অন্যতম কবি, নাট্যকার ও দার্শনিক ইউলিউশ স্লোভাৎস্কি (ঔঁষরঁংু ঝłড়ধিপশর)। পোলিশ ইতিহাসে তাঁকে অন্যতম ‘জাতীয় চারণকবি’ বলা হয়, যিনি পরাধীন দেশের মানুষকে তাঁর জাদুকরী কলম দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে যক্ষ¥া রোগে আক্রান্ত হয়ে প্যারিসে নির্বাসিত অবস্থায় এই মহান শিল্পী মারা যান। তিনি বিশ্বাস করতেনÑমানুষের মৃত্যু হলেও তার অবিনাশী আত্মা প্রকৃতি, অরণ্য আর শান্ত জলের মাঝে বেঁচে থাকে। তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি বাইরে দেশের পরাধীনতার চরম অশান্তি দেখলেও, নিজের ভেতর এক মহাজাগতিক ও শান্তিময় আধ্যাত্মিক সুশৃঙ্খলতা অনুভব করতে পারতেন। পোলিশ নোটে তাঁর প্রতিকৃতির সাথে মুদ্রিত আছে তাঁর কবিতার সেই অবিনাশী পঙক্তি: "...অহফ রঃ রিষষ ফৎধি ভৎড়স ঃযব সধৎনষব ংড়সব ৎড়পশু বপযড়,/ ঝড়সব সড়ঁৎহভঁষ, ফরংঃধহঃ পযড়ৎধষ সঁংরপ,/ ডযরপয ও ঃড়ফধু ধষৎবধফু মৎধংঢ় রিঃয ধ যধষভ—ফৎবধসু সরহফ,/ ঐবধৎরহম ঃযরং রিহফ ধহফ ঃযব ংঃৎরহম নবহবধঃয ঃযব ংঃড়হব রিহফৃ" (“...আর এটি মার্বেল পাথর থেকে এক পাথুরে প্রতিধ্বনি টেনে আনবে, কোনো এক বিষাদময়, দূরবর্তী সমবেত সঙ্গীত, যা আজ আমি এখনই এক তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে অনুধাবন করতে পারছি, শুনতে পাচ্ছি এই বাতাস, আর পাথুরে বাতাসের নিচে লুকিয়ে থাকা সেই তারের সুর..”)
ব্রাজিলের ১৯৯০ সালের ৫০ ক্রুজেইরোস (ঈৎঁুবরৎড়ং) নোটে স্থান পেয়েছেন লাতিন আমেরিকার প্রভাবশালী কবি কার্লোস ড্রুমন্দ ডি আন্দ্রেদ (ঈধৎষড়ং উৎঁসসড়হফ ফব অহফৎধফব)। এই নোটে তাঁর কবিতার যে পঙক্তিগুলো রয়েছে, তা যেন মানবতার এক পরম ইশতেহার: "ঊঁ ঢ়ৎবঢ়ধৎড় ঁসধ পধহম্ফব্দড় / বস য়ঁব সরহযধ সব্দব ংব ৎবপড়হযবম্ফধৃ" (“আমি এমন এক গান তৈরি করি যা শুনে আমার মা নিজেকে চিনতে পারেন, সব মায়েরা নিজেদের খুঁজে পান, আর যা কথা বলে দুটি চোখের মতো। আমি এমন এক রাস্তায় হাঁটি যা বহু দেশের ওপর দিয়ে গেছে। তারা যদি আমায় নাও দেখে, আমি ঠিকই দেখি এবং পুরোনো বন্ধুদের অভিবাদন জানাই... আমি এমন এক গান তৈরি করি যা পুরুষদের জাগিয়ে তোলে আর শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়।”)
ব্রাজিলের আরেকটি ঐতিহাসিক নোট হলো ১৯৮৮ সালের ১,০০০ ক্রুজাদোস (ঈৎঁুধফড়ং)। এই নোটে স্থান পেয়েছেন ব্রাজিলের ঔপন্যাসিক ও কবি জোয়াকিন মারিয়া মাচাদো দে আসিস (ঔড়ধয়ঁরস গধৎরধ গধপযধফড় ফব অংংরং)। তাঁর প্রতিকৃতির পাশে তাঁর নিজের হাতের লেখায় খোদাই করা আছে শহর ও স্মৃতির এক দারুণ কোলাজ: "ও রিষষ ষরাব রিঃয ঈধঃঃবঃব, খধৎমড় ফড় গধপযধফড়, চৎধরধ ফব ইড়ঃধভড়মড় ধহফ ঋষধসবহমড়; ও ফড় হড়ঃ ংঢ়বধশ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব যিড় ষরাব ঃযবৎব, নঁঃ ড়ভ ঃযব ংঃৎববঃং, যড়ঁংবং, ভড়ঁহঃধরহং ধহফ ংযড়ঢ়ং..." (“আমি বেঁচে থাকব কাতেতে, লার্গো দো মাচাদো, প্রাইয়া দে বোতাফোগো আর ফ্লামেঙ্গোর সাথে; আমি সেখানে বসবাসকারী মানুষের কথা বলছি না, বলছি সেখানকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, ফোয়ারা আর দোকানপাটের কথা..।”)
ইউক্রেনের ২০২১ সালের ২০—হরিভনিয়া (ঐৎুাহরধ) ব্যাংকনোটের দিকে তাকালে দেখা যায় বিখ্যাত ইউক্রেনীয় কবি এবং লেখক ইভান ফ্রাঙ্কো (ওাধহ ঋৎধহশড়)—এর প্রতিকৃতি। নোটের সামনের অংশে তাঁর বিখ্যাত কবিতা "ঊধৎঃয, গু অষষ—ঋৎঁরঃরহম গড়ঃযবৎ" (পৃথিবী, আমার সর্ব—ফলদায়ী মা) থেকে সংগৃহীত অংশটি খোদাই করা আছে। একটি দেশের অস্তিত্বের লড়াইয়ে এই শব্দগুলো কতটা শক্তিশালী, তা এই পঙক্তিটি মনে করিয়ে দেয়: "ঞযব ঢ়ড়বিৎ ঃযধঃ সড়াবং রহ ুড়ঁৎ ফবঢ়ঃয, ঔঁংঃ ধ ফৎড়ঢ়, ংড় ও পধহ ংঃধহফ সড়ৎব নৎধাবষু রহ নধঃঃষব, এরাব ঃড় সব ঃড়ড়!" (“তোমার গভীরতায় যে শক্তি সঞ্চালিত হয়, তার মাত্র একটি বিন্দু আমায় দাও, যেন আমি যুদ্ধে আরও সাহসের সাথে দাঁড়াতে পারি!”)
মুদ্রার গায়ে কবিতা কেবল ব্যক্তিগত প্রেম, স্মৃতি বা দর্শনের কথাই বলে না, তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে একটি স্বাধীন দেশের জাতীয়তার কণ্ঠস্বর। তুরস্কের ১০০ লিরা নোটটি এর এক অনবদ্য উদাহরণ। এই নোটের উল্টো পিঠে স্থান পেয়েছেন তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান কবি মেহমেত আকিফ এরশয় (গবযসবঃ অশরভ ঊৎংড়ু)। তিনি কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি তুরস্কের জাতীয় সঙ্গীত ‘ইস্তিকলাল মার্শি’ (স্বাধীনতার মার্চ)—এর রচয়িতা। ১০০ লিরার নোটে তাঁর ছবির পাশে এই জাতীয় সঙ্গীতের প্রথম স্তবকের লাইনগুলো উজ্জ্বলভাবে মুদ্রিত রয়েছে, যা প্রত্যেক তুর্কি নাগরিকের মনে প্রতিদিন দেশপ্রেমের সুরটি নতুন করে গুনগুনিয়ে যায়।
টাকা হাতবদল হয়, এক হাত থেকে চলে যায় অন্য হাতে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক লেনদেনের খতিয়ানে যখন সেলমা ল্যাগেরলফ, জেমস জয়েস, ইউলিউশ স্লোভাৎস্কি কিংবা মাচাদো দে আসিসের কবিতা ও দর্শনের লাইনগুলো মানুষের আঙুল ছুঁয়ে যায়, তখন তা অর্থনীতিকে ছাপিয়ে সংস্কৃতির এক নীরব সংলাপে রূপ নেয়। ব্যাংকনোটের পাতায় মুদ্রিত এই অমর শব্দগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñসাম্রাজ্য ধ্বংস হয়, রাজনীতির পটপরিবর্তন ঘটে, মুদ্রার মান ওঠানামা করে, কিন্তু কবির শব্দ আর মানুষের হৃদয়ের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। আমাদের বাংলাদেশেও কি কখনো কোনো কাগজের নোটে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ কিংবা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার লাইন এভাবে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় পরম মমতায় স্থান করে নেবে?
