গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়—চৌদ্দ নিভৃত সুরের অনালোকিত মহিমা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবন বিশ^াসঃ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’ অথবা ‘বড় সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি’ অথবা ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’ গানগুলো যে কোকিলকণ্ঠী শিল্পীর কন্ঠে গীত হয়েছিল, তিনি আর কেউ নন, নিভৃতচারী শিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। পৃথিবীতে কিছু সুরেলা কন্ঠের আবির্ভাব ঘটে অত্যন্ত নিভৃতে—নিঝুম রাতের তিলক—কামোদ রাগের মতো; তারা চড়া আলোর মঞ্চ কাঁপায় না, অথচ মাঝরাতের একাকীত্বে শ্রোতার মনের দেয়ালে এক আশ্চর্য মায়ার জলছবি এঁকে দেয়। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা গানের ইতিহাসের সেই অন্তর্মুখী সুর—সাধিকা, যাঁর কণ্ঠ কোনো বাহ্যিক জাঁকজমক ছাড়াই মানুষের আত্মার অতি সন্নিকটে আসন পেতে নিয়েছিল। যখন চারিদিকের কোলাহল ক্লান্ত হয়ে শান্ত হয়ে আসে, যখন বুকের গহীনে কোনো এক পুরনো বিষাদ উঁকি দেয়, ঠিক তখনই প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠের উপযোগিতা টের পাওয়া যায়। তাঁর সুরের কারুকাজে সংগীতের ব্যুৎপত্তি প্রদর্শনের কোনো কসরৎ ছিল না, ছিল এক আশ্চর্য আত্মিক নিবেদন। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ২১ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে কলকাতার টালিগঞ্জে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ, সরল, অনেকখানি নিঃসঙ্গ। স্বামী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে আরও একাকীত্ব নেমে আসে। দীর্ঘ অসুস্থতা ও মানসিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে ২৯ জুলাই ২০০৪ সালে কলকাতায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
শিকড়ের পলিমাটি এবং এক অভাবী শৈশবের সুর—সংগ্রাম
নিভৃতচারী এই শিল্পীর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গের হাওয়া—মাটি। বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের অন্তর্গত বাহেরক গ্রাম ছিল তাঁর পৈতৃক ভিটা। বিক্রমপুরের সেই উর্বর সাংস্কৃতিক পলিমাটি তাঁর আত্মায় প্রচ্ছন্ন ছিল আজীবন। পিতা মণিভূষণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের একনিষ্ঠ অনুরাগী। বিশেষ করে গজল, ঠুমরি ও দাদরা গাওয়া এবং বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল প্রখর পান্ডিত্য। কিন্তু নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাসে প্রতিমার বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখনই পিতৃছায়া চিরতরে সরে যায় তাঁর জীবন থেকে। এক চরম অনিশ্চয়তা আর অভাবের করাল গ্রাসে পতিত হয় পরিবারটি। মাতা কমলাদেবী তখন অসীম সাহসে একাকী লড়াই শুরু করেন। সেই সংসার—যুদ্ধের সময়ে একটি সাধারণ হারমোনিয়াম কেনাও যেখানে এক অলীক বিলাসিতা ছিল, সেখানে মাতা কমলাদেবী নিজের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে কন্যার সুর—শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রথমে প্রকাশকালী ঘোষালের কঠোর শৃঙ্খলে এবং পরবর্তীতে কিংবদন্তি উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী ওস্তাদ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের দিব্য সান্নিধ্যে প্রতিমার সুরের বুনিয়াদটি ইস্পাতের মতো দৃঢ় হয়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় সংগীতের এই প্রচ্ছন্ন আভিজাত্যই পরবর্তীতে তাঁর আধুনিক গানগুলোকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল।
ঢাকা বেতারে প্রথম কুঁড়ি ও সেনোলার বিস্ময়
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিভার প্রথম স্ফূরণ ঘটেছিল এই বাংলার বুকেই। বাল্যকালে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ঘটনাক্রমে তাঁর গান শোনানোর সুযোগ হয় ঢাকা বেতারের শিশুবিভাগে। সেই শিশু কণ্ঠের স্বচ্ছতা আর সুরের নিখুঁত প্রক্ষেপণ শুনে তৎকালীন বেতার কর্তৃপক্ষ চমৎকৃত হয়েছিল। এরপর আর প্রতিমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাত্র এগারো বছর বয়সে, ১৯৪৫ সালে বিখ্যাত ‘সেনোলা কোম্পানি’ থেকে কুমারী প্রতিমা চট্টোপাধ্যায় নামে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়। রেকর্ডের এক পিঠে ছিল ‘প্রিয় খুলে রেখো বাতায়ন’ এবং অন্য পিঠে ‘মালাখানি দিয়ে আমারে ভোলাতে চাও’। দু’টি গানই রচনা ও সুর করেছিলেন সুকৃতি সেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেই উত্তাল সময়ে এক অবোধ শিশুর কণ্ঠে এমন স্ফটিকস্বচ্ছ সুরের প্রবাহ এবং অবলীলায় আবেগের পরিমিত প্রকাশ শ্রোতাকুলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সমকালীন সংগীতবোদ্ধারা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলা গানের আকাশে এক নতুন ধ্রুবতারার উদয় হতে চলেছে।
নেপথ্য গায়িকার অভিষেক এবং স্বর্ণযুগের সিংহাসন
১৯৫১ সালে প্রতিমার জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। প্রতিভাবান সুরকার সুধীরলাল চক্রবর্তীর নিখুঁত সুরারোপে ‘সুনন্দার বিয়ে’ চলচ্চিত্রে ‘উছল তটিনী আমি সুদূরের চাঁদ’ গানটির মাধ্যমে নেপথ্য গায়িকা হিসেবে তাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। তবে তাঁর সাঙ্গীতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক বাঁকটি আসে ১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঢুলি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই ছবিতে ‘নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতী চলে’ গানটিতে তিনি যেভাবে বৈষ্ণব পদাবলীর রস আর রাগাশ্রিত সুরের অতি সূক্ষ¥ অলঙ্কার ও তানকে এক অদ্ভুত সহজতায় পরিবেশন করেছিলেন, তা সমসাময়িক সমস্ত নামী সুরকারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এর ঠিক পরের বছরই, ১৯৫৫ সালে ‘শাপমোচন’ চলচ্চিত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জাদুকরি সুর পরিচালনায় পন্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর সাথে তাঁর গাওয়া ‘ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান’ দ্বৈত সংগীতটি তাঁকে এক কালজয়ী উচ্চতায় আসীন করে। সেই স্বর্ণযুগে যখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্রদের মতো মহীরুহরা বাংলা গানের আকাশ শাসন করছেন, সেখানে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের এক নিভৃত ও দুর্ভেদ্য সুর—দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।
গায়নশৈলীর এক অলৌকিক দিক
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়নশৈলীর এক আশ্চর্য দিক ছিল তাঁর অনড় প্রকাশভঙ্গি। আধুনিক কালের অনেক শিল্পী যেখানে সামান্য আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে মুখাবয়বের নানা কসরত কিংবা শারীরিক মুদ্রার আশ্রয় নেন, প্রতিমা ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তিনি যখন মাইকের সামনে দাঁড়াতেন, তাঁর মুখমন্ডল থাকত প্রায় স্থির, শান্ত ও ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো। কিন্তু সেই আপাত—নীরব অবয়বের ভেতর থেকে নির্গত হতো এক সুরের আগ্নেয়গিরি, যা শ্রোতার বুকের ভেতর তীব্র হাহাকার জাগিয়ে তুলত।
শব্দচিত্রের জাদুকরি ও বিষাদের মায়াজাল
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর অমর কবিতা অবলম্বনে নির্মিত ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’ গানটি শুনলে আজও মনে হয়, এক বিষাদময় গ্রাম্য রাত যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে। হারানো শৈশব, ফেলে আসা মফস্বল আর এক তীব্র নিঃসঙ্গতার এমন নিখুঁত চিত্রণ বাংলা গানে আর দ্বিতীয়টি মেলা ভার। একইভাবে ‘একটা গান লিখো আমার জন্য’ গানটির ভেতরে তিনি এক চিরন্তন অপূর্ণতার যে হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা কোনোদিন পুরনো হওয়ার নয়। তাঁর কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর গভীর বিশ্বাসযোগ্যতা। শ্রোতার মনে হতো, গায়িকা যেন অন্য কারও লেখা গান গাইছেন না, বরং নিজের জীবনের কোনো গোপন রক্তক্ষরণের গল্পই সুরে সুরে অনুবাদ করছেন।
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে কেবল আধুনিক বা চলচ্চিত্রের গানে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদী, ভজন, কীর্তন এবং লোকসংগীতের প্রতিটি ধারায় তাঁর অবাধ ও স্বচ্ছন্দ যাতায়াত ছিল। উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠিন পাঠ নিলেও তিনি কখনো পান্ডিত্যের বোঝা শ্রোতার ওপর চাপিয়ে দেননি, বরং জটিলতম সুরকেও অত্যন্ত সহজ সরল উপায়ে পরিবেশন করেছেন। ‘যদুভট্ট’, ‘ছুটি’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘পরিণীতা’, ‘দাদাঠাকুর’ এর মতো বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর গান কাহিনীর গতি পরিবর্তন করে দিয়েছিল। সাঙ্গীতিক শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হন।
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গানঃ
১। একটা গান লিখো আমার জন্য, ২। বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই, ৩। বড় সাধ জাগে একবার তোমায় দেখি, ৪। তোমার দেয়া অঙ্গুরীয়, ৫। আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি, ৬। আমার সোনা চাঁদের কণা, ৭। ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান, ৮। নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতী চলে, ৯। মন যে খুশী খুশী আজ, ১০। আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, ১১। আমার জীবন নদীর ওপারে, ১২। জলে ভাসা পদ্ম আমি, ১৩। ছলকে পড়ে কল্কে ফুলে, ১৪। মালা থেকে ফুল, ১৫। কাজল ধোয়া চোখের জলে, ১৬। তোমার দুচোখে আমার স্বপ্ন, ১৭। কুসুম দোলায় দোলে শ্যামরাই, ১৮। মনে আগুন জ্বলে চোখে কেন জ্বলে না, ১৯। ক্লান্ত শেফালী ঘুমিয়ে পড়েছে, ২০। সাতরঙ্গা এক পাখি, ২১। সজনী গো রজনীকে চলে যেতে দাও, ২২। আবীরে রাঙালো কে আমায়, ২৩। তোমায় কেন লাগছে এত চেনা, ২৪। এপারে গঙ্গা ওপারে গঙ্গা, ২৫। আঁধার আমার ভালো লাগে
পরিশেষ
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা গানের এক নিভৃত অথচ দীপ্ত অধ্যায়, মিতভাষী অথচ অতলান্ত সৌন্দর্যের সুর—সরোবর। তিনি তাঁর জীবনের প্রতিকুলতা আর নীরব বেদনাকে সুরে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাই তাঁর কণ্ঠে আনন্দও কখনো সম্পূর্ণ নির্ভার নয়, আবার দুঃখও কখনো সম্পূর্ণ কুহেলিকাময় অন্ধকার নয়, সেখানে রয়েছে এক অলৌকিক আলো—ছায়ার কোমল মিশ্রণ। প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক পৃথিবীতে গান যেখানে প্রায়শই ক্ষণস্থায়ী পণ্য হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধ্রুপদী স্বর হতে পারে বাংলা গানের হারানো ঐতিহ্যকে পুনজীর্বিত ও মার্জিত করার এক শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল অতীতের কোনো অধ্যায় নন, তিনি বাঙালির সুর—স্মৃতির এক অবিনাশী বর্তমান।
