মেয়র মামদানির বিশেষ সম্মাননা বন্যা ও স্বপ্নীলকে || জুইশ সেন্টারে একটি মুগ্ধ সঙ্গীতসন্ধ্যা
রওশন হাসানঃ গত ১২ জুলাই রবিবার জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে ‘এ্যাবাউট টাইম ইভেন্টস’ এবং ‘অল কাউন্টি হোমকেয়ার’র যৌথ উদ্যোগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি আনন্দ সন্ধ্যা আয়োজিত হয়। এ আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তী রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, রবীন্দ্র গবেষক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী স্বপ্নীল সজীব। এই অনুষ্ঠানে সঙ্গীত, নৃত্য ও সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। স্বপ্নীল সজীব এবং রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান ও কথার পরিবেশনা পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে এক অনন্য আবহ সৃষ্টি করে। এই আয়োজনে নিউইয়র্কের বিশিষ্টবর্গ, মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসকসহ সংস্কৃতিপ্রবণ বাঙালিরা অংশগ্রহণ করেন। পুরো অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন শারমিনা সিরাজ সোনিয়া। কবিতা পাঠ করেন আবৃত্তিশিল্পী সাবিনা নীরু।
শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বিভিন্ন স্বাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিশেষ করে বর্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে রবীন্দ্রঙ্গীত পরিবেশন করেন। এক পর্যায়ে তিনি পুরো অডিয়েন্সকে আহবান করেন কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে সঙ্গীত পরিবেশনার। পুরো হলজুড়ে বিপুল সাড়া ও সুরে কন্ঠ মিলিয়ে অংশগ্রহণকারী শ্রোতা রবীন্দ্রসঙ্গীতে নিমগ্ন হন। কয়েকটি গান পরিবেশনার আগে শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা রবীন্দ্রনাথ কখন কোন পরিস্থিতিতে গানটি রচনা করেছিলেন তার পটভূমি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, মূলত ইংরেজি অনূদিত ‘গীতাঞ্জলি’তে তিনি জীবনের পূর্ণতার প্রকাশ এবং গীতাঞ্জলি’তে প্রচ্ছন্ন সূক্ষ্ম বৈষ্ণব আভাস রয়েছে। ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে মূল বাংলা গীতাঞ্জলির বহু কবিতা বর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের কিছু গানে উদ্ভূত বহুমাত্রিকতা রয়েছে। গানগুলো পূজা পর্যায়ের গান, প্রেম পর্যায়ের গান ও বর্ষার গানেও হতে পারে। কবিগুরু তাঁর কল্পনানুযায়ী বিশেয চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ রচিত বর্ষা সম্বন্ধীয় গান সম্পর্কে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে তাঁর গানে তিনটি রূপে উপস্থাপন করেছেন, বর্ষা আবাহন, ঘন বর্ষা ও শেষ বর্ষা। তিনি আরও বলেন, কালিদাসের মেঘদূত সাহিত্য তিনি তাঁর বর্ষা রচনায় বেঁধেছিলেন।
বিশিষ্ট তবলাবাদক পিনুসেন দাসের তবলা সঙ্গত এ আয়োজনকে অর্থবহ করে তোলে। শিল্পী পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলোঃ ‘আমারে তুমি অশেষ করেছো’, ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’, ‘বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো’, ‘মন মোর মেঘেরও সঙ্গী’, ‘এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ এবং সর্বশেষ পরিবেশনা ছিলো ‘সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে’।
অনুষ্ঠানে মেয়র জোহরান মামদানি কর্তৃক দুই শিল্পীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। বাঙালি সংস্কৃতি, রবীন্দ্রসংগীত এবং বাঙালির ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুলে ধরার স্বীকৃতিস্বরূপ রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও স্বপ্নীল সজীবের হাতে বিশেষ সম্মাননা সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো মেয়রের পক্ষ থেকে সঙ্গীততশিল্পীদের এ ধরনের স্বীকৃতি প্রদান এ আয়োজনে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
সম্মাননা গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, রবীন্দ্রনাথের গান কেবল সুর বা সঙ্গীত নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক। প্রবাসের মাটিতে তাঁর সৃষ্টিকে ঘিরে এমন আন্তরিক আয়োজন এবং এই সম্মাননা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তরুণ শিল্পী স্বপ্নীল সজীব তার উপলব্ধি প্রকাশ করে বলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তার শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। নিউইয়র্ক সিটির এই সম্মাননা তার সঙ্গীতযাত্রায় একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।। সঙ্গীতের পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে অন্যতম আকর্ষণ ছিল নৃত্যশিল্পী রাসেল আহমেদের দ্বৈত নৃত্য পরিবেশনা। তার চমৎকার ও নান্দনিক উপস্থাপনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে।
এ আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক তসলিমা নাসরিন ও খলঅভিনেতা আহমেদ শরীফ। লেখক তসলিমা নাসরিন আয়োজকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এমন মনোজ্ঞ উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, বাঙালি সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত ও ঐতিহ্য শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়; এটি বিশ্ব সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অল কাউন্টি হোমকেয়ারের চেয়ারউয়োম্যান সিফা আমিন উপস্থিত সকল অতিথি, শিল্পী, আয়োজক, পৃষ্ঠপোষক ও দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে তিনি অল কাউন্টি হোমকেয়ারের বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে অবহিত করে প্রবাসী কমিউনিটির সকলকে প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণের অনুরোধ জানান।
রবীন্দ্রসঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি এ সন্ধ্যাটি আনন্দমুখর করে তোলে।
