যা দেখেছি যা বুঝেছি—২০ || মনিরুল ইসলাম

নিজের খোঁজে

আবেগ/ Emotion: আবেগ হল আমাদের আভ্যন্তরীণ দৈহিকমানসিক ভারসাম্যের বিচ্যুতি, যা অনুভব করা যায় এবং বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে, নাও পারে। চিন্তাবুদ্ধি নয়, আবেগ দ্বারাই মানুষ পরিচালিত হয়। আবেগকে সন্তুষ্ট করার জন্যই বুদ্ধিমান মানুষ চিন্তাকে ব্যবহার করে। যেমন: পাখিটা আমার। আবেগ জন্মলব্ধ, শিক্ষালব্ধ নয়। কিন্তু এর প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ শিক্ষালব্ধ। আবেগের বিকাশ প্রকাশ নানা উদ্দীপক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যে আবেগ সুখানুভূতির উদ্রেক করে, ‘আকর্ষণকরে, তাকেই বলি ভালোবাসা। যা দুঃখবোধের সৃষ্টি করে, বিকর্ষণ করে, তাকে বলিবিরূপ/ব্যর্থতা ব্যক্তিবিশেষে একই আবেগ দুর্বল বা অতি শক্তিশালী হতে পারে। একই জিনিসের প্রতি একই সময়ে দুই বিপরীতধমীর্ আবেগ (ভালবাসা ঘৃণা) কি অনুভব করা যায়যায়। যেমন, হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলি। মানুষের মন আধাআধি হয়ে একই সময়ে দুর্ভাবনায় পড়ে, আবার রিলাক্স করে।

ব্যক্তিত্ব/ Personality: ব্যক্তির কতগুলো বৈশিষ্ট্যের একক অনন্য অভিব্যক্তি যা তার আচরণে পুনরাবৃত্তি দান করে এবং একব্যক্তিকে অন্যব্যক্তি থেকে পৃথক করে। সামাজিক পরিবেশে আচরণসমূহের সমন্বিত রূপ/প্যাটার্ন দেখে ব্যক্তিত্ব নিণীর্ত হয়। ব্যক্তিরসামগ্রিক ছাপ(overall impressionবা ভাবমূর্তি অবশ্য পরিবর্তনশীল আপেক্ষিক ধারণা, যা একজনের নিকট ইতিবাচক হলেও আরেকজনের নিকট নেতিবাচক মনে হতে পারে। যেমন: পাখিটা সরাও। 

শারীরিক ক্রমবিকাশ এবং পারিপাশি^র্ক সামাজিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিত্ব বিকশিত অর্জিত হতে থাকে। শারীরবৃত্তীয় উপাদান হল ) বংশগত: যা মানসিক ছাঁচ নির্ধারণ করে। ) হরমোন: দৈহিক শক্তি, আবেগ, উদ্দীপনা, দেহমনের বর্ধন, সহ্যক্ষমতা ইত্যাদির নিয়ন্ত্রক। ) ব্যক্তির দৈহিক গঠন তার ব্যক্তিত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাহায্যে গড়ে ওঠে ব্যক্তির মূল্যবোধ, রুচি, আচারব্যবহারের ধারা। তবে সামাজিক পরিবেশ এক হলেও একে গ্রহণ করার ক্ষমতা ইচ্ছা সমান নয় বলে একই পরিবারের দুভাই ভিন্ন প্রকৃতির ব্যক্তিত্ব লাভ করতে পারে। সুতরাং ব্যক্তিত্বের মধ্যে থাকে জৈবিক সামাজিক উপাদান, শিক্ষা, সংস্কৃতি অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য মানসিক প্রক্রিয়াসমূহ (যেমন, মনোভাব), যা চিন্তা আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যক্তিত্বের প্রকাশ সময়পরিবেশপরিস্থিতি ভেদে ভিন্নতর হতে পারে। Nature and Nurture  প্রকৃতি পরিবেশ ব্যক্তিত্ব ঠিক করে দেয়।

মনোভাব/ Attitude: সামাজিক পরিমন্ডলে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে ব্যক্তির আপেক্ষিক স্থায়ী ধারণা বা মূল্যায়নকে বলে মনোভাব, যার ওপর তার বিশ্বাস/অবিশ্বাস জন্মেছে এবং সে অনুযায়ী কাজ করা নাকরার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। একে বলা যায় প্রতিক্রিয়াপ্রস্তুতি। যেমন: পাখিটা কাজের। মনোভাবের সক্রিয় অবস্থাই উদ্দেশ্য বা প্রেষণা, তবে মনোভাব প্রকাশ করি (প্রচ্ছন্ন থাকতে পারে), উদ্দেশ্য চরিতার্থ করি। বুদ্ধিমান মানুষ মনোভাবের ভিতরটাকে ঢেকে রাখে, দরকারীটাকে আলোকিত করে।

বুদ্ধি/ Intelligence: যুক্তি বা জ্ঞান প্রয়োগের মানসিক ক্ষমতাকে বুদ্ধি বলে, যার মাধ্যমে প্রাণী বিভিন্ন পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া শিখতে হয়, এই শিক্ষার ক্ষমতা যার যত বেশি, সে তত বেশি বুদ্ধিমান। সুতরাং বুদ্ধি হল শিক্ষণের ক্ষমতা এবং শিক্ষণের ফলকে কাজে লাগানোর দক্ষতা। পরিবর্তনশীল আচরণ করার ক্ষমতা তথা নতুন পরিবেশে নতুন আচরণ করার দ্রুততার কারণেই মানুষ শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রাণী। পরিবেশের সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষ যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়া শিখতে পারে, পূর্বাভিজ্ঞতা স্মরণ করতে পারে এবং চিন্তা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রাণীস্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে বুদ্ধির ক্রমপর্যায় আছে, যা আচরণের পরিবর্তনশীলতার মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় এবং ব্যক্তির কর্মসম্পাদন (চবৎভড়ৎসধহপব) দিয়ে তা দৃশ্যমান হয়। যেমন: পাখিটা অসুস্থ। সময় পরিস্থিতির পরিবর্তনে ব্যক্তির বুদ্ধির মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। বুদ্ধির পরিমাণ/প্রখরতা বংশানুক্রমে জিনের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। রহস্যময় কারণে মানুষের আবেগ বুদ্ধি মেধা প্রজ্ঞা ভিন্ন মাত্রায় হয়। 

মেধা/ Merit: বোধশক্তির পরিমাপক। স্মরণশক্তি, ধীসম্পন্ন গুণবাচক অর্থে বলি। যেমন: পাখিটা চতুর। মেধার ব্যবহারটাই মুখ্য বিষয়, কুসুমকলির মতো Ñ ফুটে সৌরভ ছড়াতে পারে, বা পচে দুর্গন্ধময় হতে পারে।

শিক্ষণ/ Learning: নতুন নতুন সংযোগ স্থাপন করার ক্ষমতার্জন, বিভিন্ন সংকেতের প্রতিক্রিয়া করতে জানা। শিক্ষণের জন্য দরকার সমস্যা, তাড়না, অনুশীলন, ফলপ্রাপ্তি, সান্নিধ্য। অভিজ্ঞতা অনুশীলনের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী যে পরিবর্তন সৃষ্টি হয়, তাকেই শিক্ষণ বলে। স্নায়বিক তথা মস্তিষ্কের সংগঠন যত উন্নত, শিক্ষণক্ষমতা ততবেশি। যেমন: পাখিটা শিকারী। শিক্ষণ জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া, তবে শৈশবকৈশোরে যা শিখে তার প্রভাব আজীবন রয়ে যায়। প্রয়োজনে সবাইকে সবকিছুতে প্রশিক্ষিত করা যায়, বিশেষত শিশু হলকাদামাটি’, তাকে যাচ্ছেতাই বানানো যায়। 

জ্ঞান/ Knowledge: শিক্ষণে যা অর্জিত হয়, তা জ্ঞান। জ্ঞান থাকে ভেতরে, তথ্য বাইরে। জ্ঞান বসে থাকে, তথ্য উড়ে বেড়ায়। জ্ঞান শান্ত করে, তথ্য উত্তপ্ত করে। জ্ঞানদানে জ্ঞানের বৃদ্ধি হয়, তথ্য বিনিময়ে/শেয়ারে ক্ষতি হয়।

প্রজ্ঞা/ Wisdom: অভিজ্ঞা। শিক্ষণের ব্যবহারিক প্রয়োগ, যার উৎস হল প্রত্যক্ষণ অভিজ্ঞতা। বুদ্ধিমান মানুষই সময়ের পেছনে যেতে পারে, যার নাম অভিজ্ঞতা। স্তরানুসারে: শিক্ষণজ্ঞানঅভিজ্ঞতাপ্রজ্ঞা।

স্মৃতি/ Memory: পূর্বাভিজ্ঞতা স্মরণ। শিক্ষণের পুনরুদ্দীপনা। যেমন: পাখিটা সঙ্গকাতর। যে ঘটনার সাথে আবেগ জড়িত, তা স্মৃতি হয়ে জমা হয়। অতীতের সুখ বা দুঃখের অভিজ্ঞতায় মানুষ ফিরে যায়, নতুন সুখদুঃখের আগমনে পুরনো সুখদুঃখগুলোও জেগে ওঠে। তবে সুখস্মৃতি রোমন্থন করি, দুঃখাভিজ্ঞতা চেপে লুকিয়ে রাখতে চাই। 

অন্তর্দৃষ্টি/ / Insight:  শিক্ষণের পর একটি অবস্থাকে নতুনভাবে হঠাৎ প্রত্যক্ষণ করার নাম অন্তর্দৃষ্টি। এসময় সমস্যার সমাধান হঠাৎ মনে উদয় হলে মানুষইউরেকাবলে লাফিয়ে উঠে। যেমন: পাখিটা দুঃখিত। খন্ডিত নয়, সামগ্রিক অনুধাবন। এটি জ্ঞানের গভীরতর প্রায়োগিক দিক, যেমন ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা সমাধানের নতুন পথ আবিষ্কার করা হয়।

আত্মজ্ঞান/ Introspection: নিজ চিত্তচেতনাকর্ম অনুধাবন করে আত্মদর্শন, দিব্যদৃষ্টি। যেমন: পাখিটা মুক্তিপিয়াসী। 

দূরদৃষ্টি/ Intuition : একে বলা হয় জ্ঞানলাভের ষষ্ঠেন্দ্রিয়। বুদ্ধির উচ্চতর স্তর, যা দিয়ে ব্যক্তি অজ্ঞাত কোনোকিছুঅঁাচকরতে পারে। যেমন: পাখিটা বিষণ্ণ। পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা যে জগতের অভিজ্ঞান লাভ করা যায়, তার বাইরেও আরেক জগৎ বিদ্যমান, যা শুধু দূরদৃষ্টি দ্বারা লব্ধ হয়। জ্ঞান বা অভিজ্ঞতায় নয়, দূরদৃষ্টি হল জীবনকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা।

উপলব্ধি/ Realization: চিন্তা কর্মের পরিণতি হৃদয়ঙ্গম করা। যেমন: পাখিটা একা। শিক্ষণের পরবর্তী উন্নত ধাপ। মানুষ যা শেখে, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তার দুইতৃতীয়াংশ ভুলে যায়, সাতদিনে প্রায় বিস্মৃত হয়Ñযে রেশটুকু টিকে রয়, তা উপলব্ধি। উপলব্ধির পরবর্তী স্তরে আসেআলোকপ্রাপ্তি’ (বহষরমযঃবহসবহঃ) 

বিশ^াস/ Belief: ব্যক্তিগত মনোভাব, প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ বা ত্যাগ। আমরা যা সর্বান্তকরণে বিশ^াস করি, তাই যে সত্য হবে এমন নয়।  সবকিছুই আপেক্ষিক: সত্য ন্যায় সৌন্দর্য সততা কিংবা ভালমন্দ বলে কিছু নেই, যে যাকে যা মনে করে, তা তা হয়। যেমন: পাখিও ভালবাসে। 

সুখ/ Happiness: সন্তুষ্টি পূর্ণতার অনুভব। কেউ অল্পতে তুষ্ট, কেউ বেশিতেও অতৃপ্তÑসুতরাং কে কিসে কতখানি সুখী হবে ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল। সরল নিবোর্ধ যঁসরষরঃু মধ্যে সুখ আছে। মানুষ প্রকৃতির অংশ, সার্বক্ষণিক একাকী থাকলে জীবন দ্বন্দ্বময় দুর্ভাবনায় অসহায় হয়ে পড়ে। সুখের সংজ্ঞা জানে না বলেই মানুষ অসুখী। ড্যানিশ দার্শনিক সরেন কির্কেগার্ডএর মতে কোনো মানুষই নিজেকে নিয়ে খুশিসুখী নয় বলে নিজেকে বদলাতে চায়। যে পারে সে অনিচ্ছায় নিজের স্বভাব ত্যাগ করে, যে পারে না সে নিজেকে ধিক্কার দেয় অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের (ঝবষভ) ব্যাপারে হতাশ। তাই প্রত্যেক মানুষ কমবেশি হীনম্মন্যতা  (inferiority complex)- ভোগে, যার উৎস হল নিজেকে নাচেনা এবং নিজের সাফল্যের জন্য অতি সচেতনতা/তৎপরতা। নিজের উচ্চাসন/দুর্বাসনা ছেড়ে নিজে যা, তাকেই যদি গ্রহণ করি তাহলে সুখশান্তি আসবে মনে। সেজন্য তুমি যা, তা হও।


Related Posts