কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—১৮ মুদ্রার গায়ে সুর ও সংগ্রাম || আখতার আহমেদ রাশা

পৃথিবীর মানচিত্রে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ১০টি ক্ষুদ্র দ্বীপের এক অনন্য সুন্দর দেশ কেপ ভার্দে (ঈধঢ়ব ঠবৎফব) ব্যাংকনোট সংগ্রাহকদের কাছে এই দেশটির কাগজের মুদ্রাএসকুডো’ (ঊংপঁফড়) ব্যতিক্রমী নিদর্শন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেখানে তাদের মুদ্রার ক্যানভাসে যুদ্ধ, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসকে স্থান দেয়, সেখানে কেপ ভার্দে তার মুদ্রার ফ্রেমে সাজিয়ে রেখেছে সুর, সাহিত্য আর স্বাধীনতার এক অপূর্ব কোলাজ। এই সুর আর কবিতার ভিত্তিপ্রস্তর যিনি স্থাপন করেছিলেন, তিনি আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক বিপ্লবী আমিলকার কাবরাল (অসল্পষপধৎ ঈধনৎধষ) ১৯২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পর্তুগিজ গিনির (বর্তমান স্বাধীন গিনিবিসাউ) ‘বাফাতানামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান নেতা। তবে তাঁর বাবামা দুজনেই ছিলেন কেপ ভার্দের মানুষ। বাবার কাজের সূত্রে তাঁরা গিনিবিসাউয়ে থাকলেও, আমিলকারের শৈশবেই পরিবারটি কেপ ভার্দেতে ফিরে আসে। ফলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শৈশব কাটে কেপ ভার্দের লাল মাটিতেই। জন্মসূত্রে কর্মক্ষেত্রে গিনিবিসাউ, আর রক্তে শৈশবের স্মৃতিতে কেপ ভার্দেÑএই দুই দেশের সাথেই ছিল তাঁর গভীর নাড়ির টান। আর এই কারণেই তিনি দুই দেশের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে যৌথ স্বাধীনতার লড়াই পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। কাবরালকে না জানলে কেপ ভার্দে বা গিনিবিসাউÑকোনো দেশের স্বাধীন সত্ত্বাকেই চেনা সম্ভব নয়।

একাধারে কৃষি প্রকৌশলী, কবি এবং বুদ্ধিজীবী কাবরাল ছিলেন আফ্রিকার অন্যতম প্রধান উপনিবেশবিরোধী তাত্ত্বিক। তৎকালীন পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙতে তিনি এক অভিনব কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন। এই লক্ষ্যেই তিনি গঠন করেছিলেন 'চঅওএঈ' (অভৎরপধহ চধৎঃু ভড়ৎ ঃযব ওহফবঢ়বহফবহপব ড়ভ এঁরহবধ ধহফ ঈধঢ়ব ঠবৎফব) গিনিবিসাউয়ের ঘন জঙ্গল আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করে তিনি যে গেরিলা রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সফল উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম হিসেবে স্বীকৃত।

কাবরাল বলতেন, ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম কেবল সামরিক যুদ্ধ নয়, তাহলো সংস্কৃতিরই এক মহোত্তম প্রকাশ।কিন্তু দুর্ভাগ্য, কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সূর্য দেখার ঠিক কয়েক মাস আগে, ১৯৭৩ সালের ২০ জানুয়ারি এই মহান নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তবে বুলেট দিয়ে তাঁর অবিনাশী চেতনাকে মুছে ফেলা যায়নি। স্বাধীনতার পর গিনিবিসাউয়ের সাবেক মুদ্রাপেসোএবং কেপ ভার্দের আদি সিরিজের ব্যাংকনোটগুলোতে (যেমন ১৯৮৯ সালের ১০০, ১০০০ ২০০০ এসকুডো) এই দূরদর্শী নেতার প্রতিকৃতি জলছাপ সগৌরবে ফুটিয়ে তুলে তাঁকে জাতীয় মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে সিক্ত করা হয়।

আমিলকার কাবরাল বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন জাতির আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সংস্কৃতি শিল্পের ভেতর। তাঁর সেই অমর দর্শনকে অক্ষরে অক্ষরে ধারণ করেই যেন কেপ ভার্দে তাদের আধুনিক ব্যাংকনোট সিরিজটি (২০১৪বর্তমান) সাজিয়েছে। বন্দুক কিংবা ক্ষমতার দাপট সরিয়ে এই নোটগুলিতে ঠাঁই পেয়েছে দেশটির নামকরা শিল্পী, লেখক আর কবিদের ছবি।

কেপ ভার্দের ২০০০ এসকুডো নোটটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ব্যাংকনোট। এতে স্থান পেয়েছেন কেপ ভার্দের বিশ্বখ্যাত গায়িকা সিজারিয়া ইভোরা, যাঁকে বিশ্ববাসীখালি পায়ের ডিভা’ (ইধৎবভড়ড়ঃ উরাধ) নামে চেনে। দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে যিনি সারাজীবন খালি পায়ে বিশ্বমঞ্চে গান গেয়েছেন এবং কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহী বিষাদময় সুরের গানমোরনা’ (গড়ৎহধ)—কে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। নোটে তাঁর ছবির পাশে একটি মাইক্রোফোন সুরের স্টাফের নকশা যেন কাগজের এই মুদ্রাকেই এক জীবন্ত সুরের মূর্ছনায় রূপ দিয়েছে। ১০০০ এসকুডো নোটে চিত্রিত করা হয়েছে কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহীফুনানা’ (ঋঁহধহপ্স) সংগীতের প্রবাদপুরুষ সুরকার গ্রেগোরিও ভাজকে, যিনিকোদে দি দোনানামে পরিচিত। নোটে তাঁর অ্যাকোর্ডিয়ন বাজানোর চমৎকার একটি প্রতিকৃতি রয়েছে, যা মুদ্রাকে দিয়েছে এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্য। কেপ ভার্দের ৫০০ এসকুডো নোটটি উৎসর্গ করা হয়েছে কেপ ভার্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জর্জ বারবোসাকে। ১৯৩০এর দশকে কেপ ভার্দের বিখ্যাত সাহিত্য আন্দোলনক্লারিদাদে’ (যার অর্থ আলো)—এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি, যার মাধ্যমে দেশটির বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ভিত তৈরি হয়েছিল। বর্তমানের ২০০ এসকুডোর পলিমার নোটটি উৎসর্গ করা হয়েছে কেপ ভার্দের প্রখ্যাত চিকিৎসক কথাসাহিত্যিক হেনরিক তেইশেইরা দে সুজাকে। এই নোটে তাঁর ছবির সাথে চমৎকারভাবে একটি কলমের নিব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গিনিবিসাউয়ের জঙ্গল থেকে শুরু হওয়া আমিলকার কাবরালের যে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক লড়াইÑ তার চূড়ান্ত ফসল আজ কেপ ভার্দের এই আধুনিক মুদ্রা। আমিলকার কাবরালের সেই অমর দর্শনকে ধারণ করেই আজ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জানান দিচ্ছে এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি। কাগজের ক্যানভাসে সুর আর কবিতার যে জয়গান আমরা দেখি, ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও কেপ ভার্দের ফুটবলাররা সবুজ মাঠে ঠিক তেমনি এক নান্দনিক রূপকথা উপহার দিয়েছে। মাঠে তাদের অসাধারণ দক্ষতা আর লড়াকু মানসিকতা যেন সেই চিরন্তন বিপ্লবী চেতনারই এক আধুনিক রূপ। শাসকের অহংকার কিংবা রাজনীতির ঘোলাজল সাময়িকভাবে অনেক কিছু ওলটপালট করতে পারে, কিন্তু কাগজের এই ক্ষুদ্র ক্যানভাসে আঁকা বীরশিল্পীদের ইতিহাস কিংবা সবুজ মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করা ফুটবলারদের গৌরব চিরকাল অবিনশ্বর থেকে যায়। কেপ ভার্দের ব্যাংকনোট তাই কেবল কোনো কাগজের টুকরো নয়; এটি আটলান্টিকের বুকে জেগে থাকা এক স্বাধীন জাতির দ্রোহ, কবিতা আর সুরের এক জীবন্ত ক্যানভাস।


Related Posts