জয়ে—পরাজয়ে ● আনন্দ—বেদনায় ● চরম উত্তেজনায় || শেষ হচ্ছে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বিশ^কাপ
বিশেষ প্রতিবেদনঃ বিশ্বজুড়ে প্রায় সব বয়সের শত কোটি মানুষকে নির্মল আনন্দ—বেদনায়, সরল টেনশনে, চরম উত্তেজনার তুঙ্গে তুলে বিশ্বব্যাপি যে ফুটবলের অনির্বচনীয় আসর তার যবনিকা হতে যাচ্ছে আগামীকাল রবিবার। নতুন নামকরণ করা নিউইয়র্ক—নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনালের প্রতীক্ষায় এইসব মানুষ। বাংলাদেশে তখন মধ্যরাত। অবশ্যই এই রাতে উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ জেগে থাকবে। ফাইনালে অবতীর্ণ হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এই দুই দেশের মধ্যে আর্জেন্টিনার সমর্থক সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ ফিফার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে স্পেন ইয়োরোপীয়ান চ্যাম্পিয়ন। এই প্রথম তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি অবতীর্ণ হচ্ছে। কে জিতবে? এটা বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। ঘরে ঘরে এই জয়—পরাজয় বা ফেভারিট নিয়ে ভাগাভাগি, তর্ক—বিতর্ক, এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হিসাব নিকাশ করে বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ এ যাবতকালের সর্ববৃহৎ। এর আয়ও বিশাল। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল যখন চলছে, তখন পৃথিবীর কোথাও চলছে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, উড়ছে বারুদের গন্ধ, ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় কান্না আর হাহাকার, কোথাও বন্যায় ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি আর ফসলের মাঠের নির্মম চিত্র। এই সময় পৃথিবীর কত কোটি মানুষ নিরন্ন ঘুমিয়ে পড়বে, কত মানুষ সংকটের জালে আটকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অথচ এই ৪০ দিনব্যাপি মানুষ নির্মল আনন্দ করেছে। ফেসবুক ভাসিয়ে দিয়েছে স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে। এটাও মানবজাতির বিশাল প্রাপ্তি। আর আনন্দের চূড়ান্ত আনন্দ অপেক্ষা করছে যারা জিতবে তাদের এবং তাদের দেশের ও তাদের সমর্থকদের জন্য। তবে সেই আনন্দ ভাগ করে নেবে সকলেই।
প্রাপ্ত খবরে বলা হয়েছেঃ ফিফা কর্তৃক পূর্বে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০২৬ বিশ্বকাপের বিজয়ী দল পুরস্কার হিসেবে ৫০ মিলিয়ন ডলার পাবে, যা এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের জন্য মোট আর্থিক তহবিলের পরিমাণ ৭২৭ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বরাদ্দ করা হয়। রানার—আপ পায় ৩৩ মিলিয়ন ডলার, তৃতীয় স্থান অধিকারী দল পায় ২৯ মিলিয়ন ডলার, চতুর্থ স্থান অধিকারী দল পায় ২৭ মিলিয়ন ডলার, কোয়ার্টার—ফাইনালিস্টরা পায় ১৯ মিলিয়ন ডলার, রাউন্ড অফ ১৬—এর দলগুলো পায় ১৫ মিলিয়ন ডলার, রাউন্ড অফ ৩২—এর দলগুলো পায় ১১ মিলিয়ন ডলার এবং ৩৩তম থেকে ৪৮তম স্থানাধিকারী দলগুলো পায় ৯ মিলিয়ন ডলার।
পারফরম্যান্স—ভিত্তিক বোনাসের পাশাপাশি, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি যোগ্যতাসম্পন্ন দল সহায়তা হিসেবে ১.৫ মিলিয়ন ডলার পাবে, যার অর্থ হলো ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ন্যূনতম ১০.৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়া নিশ্চিত করবে।
২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায়, যখন আর্জেন্টিনা বিজয়ী হিসেবে ৪২ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিল, ২০২৬ সালের চ্যাম্পিয়নের জন্য পুরস্কারের অর্থ ৮ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে, যা প্রায় ১৯ শতাংশের সমতুল্য।
এর আগে, ফিফার একজন মুখপাত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন: ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে আর্থিক অবদানের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হবে এবং ফিফা তার ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে থাকতে পেরে গর্বিত।’
চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। বেশি দেশ অংশ নেয়ায় এবং ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে বিপুল অর্থ আয়ের সুযোগ। মাঠের ভেতরে ফুটবল তারকারা যখন নতুন ইতিহাস গড়ছেন, মাঠের বাইরে তখন কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য চলছে। তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহে সবাই লাভবান হতে পারেনি। চলতি এই বিশ্বকাপ থেকে কারা লাভবান এবং কাদের লোকসান হয়েছে তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। তারই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো।
আকাশচুম্বী আয় ফিফার: বিশ্বকাপ থেকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আয় রীতিমতো আকাশচুম্বী। কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে এবারের আসরে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ৪৮টি হওয়ায় আয় পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট মারিওন ল্যাবুরে জানান, এবারের আসর থেকে ফিফার আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে, তাই নিঃসন্দেহে ফিফাই এখানে সবচেয়ে বড় জয়ী। সম্প্রচার স্বত্ব, লাইসেন্সিং, হসপিটালিটি রাইটস, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে ফিফা এই অর্থ আয় করে। এছাড়া ফিফা টিকিট পুনরবিক্রয়ের নিজস্ব সেকেন্ডারি মার্কেট চালু করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ ফি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে ফিফা টুর্নামেন্টের পরিধি আরও বাড়িয়ে ৬৪ দল করার কথা ভাবছে, যা চীন ও ভারতের মতো বিপুল দর্শকপ্রিয় বাজারকে যুক্ত করে আয় আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
পকেট কাটা গেছে ফুটবলপ্রেমীদের: সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য খেলা দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে খরচ করতে হয়েছে চড়া মূল্য। তাদের জন্য আর্থিক দিক থেকে এই টুর্নামেন্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে। টিকিটের পেছনেই ভক্তদের বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়েছে। টিকিটের চাহিদা বাড়লে দাম বাড়িয়ে দেয়ার যে ডায়নামিক প্রাইসিং কৌশল ফিফা নিয়েছে, তা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এক প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেছেন যে, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে নিজ দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য ১,০০০ ডলার টিকিট মূল্য তিনি কখনো দিতেন না।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের টিকিটের অফিশিয়াল দাম ধরা হয়েছিল ৩২,৯৭০ ডলার, যেখানে পুনরবিক্রয়ের বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো অবশ্য এই চড়া দামের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্টের খরচের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। টিকিট ছাড়াও বিমান ভাড়া, খাবার ও আবাসন খরচে ভক্তরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। নিউ জার্সি ট্রানজিট ট্রেনের ভাড়া সাধারণত ফিরতি যাত্রাসহ ১২.৯০ ডলার হলেও বিশ্বকাপের সময় তা বাড়িয়ে ১৫০ ডলার করা হয়েছিল, যা তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরে কিছুটা কমানো হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
বড় লাভবান সম্প্রচারক ও স্পনসররা: খেলা সম্প্রচারের জন্য টিভি চ্যানেলগুলোকে বিপুল অর্থ গুনতে হলেও দর্শক সংখ্যা ও স্পনসরদের প্রবল আগ্রহের কারণে বিজ্ঞাপন স্লট বিক্রি করে তারা বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নিচ্ছে। ফিফা এই বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের জন্য হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি চালু করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এটিকে পুরোপুরি খেলার ভেতরের বিষয় বললেও এই ৯০ সেকেন্ডের বিরতি সম্প্রচারকদের জন্য বিজ্ঞাপনের নতুন বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকরা খেলা চলাকালীন বিজ্ঞাপনের বিরতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় এটি দারুণ কাজে দিয়েছে। ফক্স স্পোর্টস, যারা প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছে, তারা এই বিরতিগুলোকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপে প্রচার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের প্রতিটি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লটের মূল্য ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হাইড্রেশন ব্রেকের বিজ্ঞাপন থেকে ২৫ কোটি ডলার উঠে আসতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বিবিসি ও আইটিভির দর্শকরা এই বিজ্ঞাপন থেকে রক্ষা পেয়েছেন, কারণ বিবিসি কোনো বিজ্ঞাপন দেখায় না এবং আইটিভিও তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। পাশাপাশি অফিসিয়াল স্পনসর যেমন অ্যাডিডাস ও কোকা—কোলা বিপুল অর্থ খরচ করে মাঠের চারপাশে নিজেদের ব্র্যান্ডিং ছড়িয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
যে ১১ রেকর্ডের অপেক্ষায় মেসি
১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবেন লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। তবে এই ম্যাচটি শুধু শিরোপা নির্ধারণের লড়াই নয়। বরং লিওনেল মেসির জন্য অপেক্ষা করছে অনন্য ১১টি ব্যক্তিগত রেকর্ডের হাতছানি। ফাইনালে মাঠে নামা থেকে শুরু করে গোল করা কিংবা ট্রফি জেতা, সবকিছু মিলিয়ে মেসি ছুঁতে পারেন একাধিক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এক নজরে ফাইনালে মেসির সামনে থাকা ১১টি সম্ভাব্য রেকর্ড
১. গোলরক্ষক ছাড়া সবচেয়ে বয়স্ক ফাইনালিস্ট: ফাইনালের দিন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর ২৫ দিন। ফুটবল ইতিহাসে গোলরক্ষক বাদে কোনো খেলোয়াড় এত বেশি বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামেননি। রেকর্ডটি এখনও ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফেরের দখলে আছে। ৪০ বছর ১৩৩ দিনে তিনি পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ১৯৮২ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিলেন। মেসি এবারের বিশ্বকাপে ফাইনালে নামলে, আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে তিনিই হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফাইনালিস্ট।
২. দ্বিতীয় অধিনায়ক হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল: ২০১৪ ও ২০২২ সালের পর মেসির এটি তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এর আগে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফু ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালে টানা তিনটি ফাইনালে খেলেছিলেন। সেই অভিজাত তালিকায় মেসি দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম লেখাতে চলেছেন।
৩. প্রথম অধিনায়ক হিসেবে তিন ফাইনাল নেতৃত্ব: ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি অধিনায়কের নাম রয়েছে, যারা দুবার দলকে ফাইনালে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মেসিই হবেন প্রথম খেলোয়াড়, যিনি তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামবেন।
৪. অধিনায়ক হিসেবে জোড়া বিশ্বকাপ শিরোপা: ফুটবলে দুবার বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড় অনেক আছেন, কিন্তু দুইবারই ‘অধিনায়ক’ হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার নজির নেই। ইতালি ও ব্রাজিলের অনেক তারকা দুবার বিশ্বজয়ী হলেও তাদের কেউ অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয়বার ট্রফি ধরেননি। আর্জেন্টিনা জিতলে মেসি হবেন ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক যিনি দুবার বিশ্বকাপ শিরোপা নিজের হাতে নেওয়ার অনন্য রেকর্ডের মালিক হবেন।
৫. ফাইনালের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা: ফাইনালে গোল করা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বড় প্রাপ্তি। স্পেনের বিপক্ষে মেসি গোল পেলে তিনি ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করা সুইডেনের নিলস লিডহোমের (৩৫ বছর ২৬৪ দিন) রেকর্ডটি ভেঙে দেবেন। এটি তাকে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হিসেবে অমর করে রাখবে।
৬. আর্জেন্টিনার হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল: ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিল ৮টি গোল করেছিলেন। ৯৬ বছর ধরে এটিই ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে এক আসরে সর্বোচ্চ গোল। এবারের বিশ্বকাপে মেসি ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে ফেলেছেন। ফাইনালে একটি গোল করলেই তিনি স্তাবিলকে টপকে এককভাবে নতুন রেকর্ড গড়ে ফেলবেন।
৭. ১০ গোলের মাইলফলক: এক আসরে ১০ গোল করা মানেই ফুটবলারদের একটি বিশেষ অভিজাত ক্লাবে জায়গা পাওয়া। যদি মেসি ফাইনালে জোড়া গোল করতে পারেন, তবে তিনি জাস্ট ফনটেইন (১৩ গোল), স্যান্ডর কোসিস (১১ গোল) এবং গার্ড মুলারের (১০ গোল) তালিকায় নাম লেখাবেন। ইউরোপের বাইরে জন্ম নেওয়া কোনো ফুটবলারের জন্য এটি হবে এক অবিশ্বাস্য অর্জন।
৮. দুটি আলাদা বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল: ২০২২ সালের ফাইনালে মেসি গোল করেছিলেন। যদি ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে তিনি গোল করতে পারেন, তবে তিনি ভাভা, পেলে, পল ব্রেইটনার, জিনেদিন জিদান ও কিলিয়ান এমবাপ্পেদের মত ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়বেন।
৯. বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল: ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হয়ে রোনালদো ৮টি গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনা যদি এবার চ্যাম্পিয়ন হয় এবং মেসি কমপক্ষে একটি গোল করেন, তবে তিনি ৯ গোল নিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কোনো দলের খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ডটি নিজের করে নেবেন।
১০. ফাইনালের সর্বোচ্চ গোলদাতা: বিশ্বকাপ ফাইনালে এককভাবে সর্বোচ্চ ৪টি গোলের মালিক কিলিয়ান এমবাপ্পে। মেসি যদি ফাইনালে দুটি গোল করতে পারেন, তবে তিনি এমবাপ্পের সেই রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর যদি হ্যাটট্রিক করতে পারেন, তবে ৫ গোল নিয়ে তিনি এককভাবে এই তালিকার শীর্ষে উঠে আসবেন এবং জিওফ হার্স্টের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিকের অনন্য কীর্তি গড়বেন।
১১. সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়: টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয় করা বিরল ঘটনা। এর আগে ইতালি (১৯৩৪, ১৯৩৮) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮, ১৯৬২) এই নজির গড়েছিল। আর্জেন্টিনা এবার জিতলে মেসি হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার যিনি টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের নীল্টন সান্তোস ৩৭ বছর বয়সে এই রেকর্ড গড়েছিলেন, মেসি সেটি অতিক্রম করবেন।
২৭ ফুট উচ্চতার ‘লেগো বিশ্বকাপ ট্রফি’তে বিশ্বরেকর্ড
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ পর্যায়ের উত্তেজনা যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের বিখ্যাত রকেফেলার সেন্টার প্লাজায় দেখা মিলেছে এক ব্যতিক্রমী আয়োজনের। যেখানে প্রতিবছর বড়দিন উপলক্ষে বিশাল ক্রিসমাস ট্রি স্থাপন করা হয়, এবার সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে লেগো দিয়ে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ।
১.৩৬ মিলিয়নেরও বেশি লেগো ব্রিক ব্যবহার করে নির্মিত এই বিশাল শিল্পকর্মটি ফিফা ফ্যান ভিলেজের অংশ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। এটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীরা।
লেগোর তৈরি এই বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ২৭ ফুট এবং ওজন প্রায় ৪.২ টন। চেক প্রজাতন্ত্রের একটি লেগো কারখানায় ৫৯ জন বিশেষজ্ঞের দীর্ঘ ৭ হাজার ৪০ ঘণ্টার পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই অনন্য স্থাপনা। ফুটবলের বৈশ্বিক উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে ফিফা ও লেগোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই প্রতিকৃতি এখন নিউইয়র্কের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
গত ৬ জুলাই ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ফুটবলার কাফু আনুষ্ঠানিকভাবে লেগোর তৈরি এই ট্রফিটি উন্মোচন করেন।
বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন ১৯ জুলাই পর্যন্ত রকেফেলার প্লাজার এই প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত থাকবে। ফুটবল ও সৃজনশীল শিল্পের এই অসাধারণ সমন্বয় দেখতে শহরজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
