বাংলাদেশী—আমেরিকানদের গৌরবগাথা ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ
যুক্তরাষ্ট্রের গৌরবময় ২৫০ বছর! আমরা যারা এই দেশে বহু বছর ধরে আছি তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এক অনন্য দেশ। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয়ভাবে যা কিছুই আমাদের জীবনে ঘটে তার প্রায় সবটাই আমাদের জন্য এক আনন্দময় নিশ্চিন্ত জীবনের স্বাদ দেয় একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। যদিও তার পেছনে একটা সংগ্রামময় সময় থাকে। তারপরেও এই জীবন আমাদের ভালো লাগে। আমরা সুন্দর সময় কাটাই। আমরা এখন এখানে আমেরিকান বলেই পরিচিত। তবে অতি স্পষ্টভাবে আমাদের এই পরিচয়ের সাথে লেপ্টে থাকে আরেকটি নাম ‘বাংলাদেশ’। আমাদের বলা হয় বাংলাদেশী—আমেরিকান। আমরা তাতে গর্বিত। কারণ আমরা একটি স্বাধীন জাতি। সংস্কৃতি, কৃষ্টি, কলায় সমৃদ্ধ জাতি। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। সেই সাথে আমরা আমেরিকাকে ভালোবাসি।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশীদের পদচারণা প্রায় বাংলাদেশের সমান বয়সী। বস্তুত তারও বেশি। আমি নিজে এদেশে এসেছি তিন দশক হবে। কিন্তু এখানে কখনো কখনো কারো সঙ্গে দেখা হয়, যাদের মুখে শুনি, তারা সেই সাড়ে পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশের উদ্ভবকাল থেকেই রয়েছেন এই দেশে। কেউ কেউ আছেন যারা তারও আগে এসেছেন। আবাস গেড়েছেন। এদেশের সাথে তাদের ভাষায় ‘ন্যাচারালাইজড’ হয়েছেন। তার পরে হয়তো জন্ম নিয়েছে এদেশেই তাদের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় প্রজন্ম। তারা সেই থেকে সন্তান—সন্ততি নিয়ে বসবাস করছেন।
এই মানুষগুলো এদেশে এসে তাদের শ্রম মেধা শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়ে নিরন্তর অবদান রেখে চলেছেন এ দেশের অর্থনীতিতে, সমাজ গঠনে। কেউ কেউ ছাড়িয়ে গেছেন প্রত্যাশারও সকল গন্ডি। এখানে এসে তারা তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন যা তাদের অমর করেছে। করেছে স্মরণীয় এবং বরণীয়।
নাম স্মরণ করতে গেলে প্রথমেই ভেসে ওঠে স্থপতি প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খানের কথা। এফআর খান হিসেবে যার বিশ্বজোড়া খ্যাতি। ১৯৭৪ সালে তার ডিজাইনে নির্মিত সিয়ার্স টাওয়ার (পরবর্তীতে উইলিস টাওয়ার) যুক্তরাষ্ট্রকে পথ দেখিয়েছে স্কাই স্ক্র্যাপার (বহুতল ভবন) গড়ে তোলার। সকলে তাকে টিউবলার ডিজাইনের জনক হিসেবেই চেনে। এফ আর খানের মেধা থেকে আসা বান্ডলড টিউব ডিজাইনকে ভিত্তি ধরেই পরবর্তীতে এদেশে তৈরি হয় ১১০ তলা বিশিষ্ট ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। আকাশচুম্বীর জন্য এই আকাশ ছোঁয়া খ্যাতির পরেও থেমে থাকেননি এফআর খান। কম্পিউটার যুগ যখন এসে গেল স্ট্র্যাকচারাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড ডিজাইনে কম্পিউটার ব্যবহারের পদ্ধতিও তারই হাতে গতি পেলো। এ ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তিনি ছিলেন বাঙালির গর্ব। বাংলাদেশের গর্ব।
আমাদের গর্বের ইতিহাসে নতুন নতুন যুক্ত হয়েছে আরও কত পালক। বিজ্ঞান প্রকৌশলে আমরা আবুল হুশামকে চিনি, যিনি সোনো নামের আর্সেনিক ফিল্টার তৈরি করে বিশ্বজোড়া নাম পেয়েছেন। কেবল তা—ই নয়, তার সেই অনন্য আবিষ্কার বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য জীবনদায়ী বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে ভূমিকা রেখেছে। ভূষিত হয়েছেন গ্রেইঞ্জার চ্যালেঞ্জ পুরস্কারে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম জাহিদ হাসানের কথাই ধরা যাক। কোয়ান্টাম ম্যাটেরিয়াল এবং টোপোলোজিকাল ফিজিক্সে যার অগ্রণী অবদান অনস্বীকার্য। কিংবা মাকসুদুল আলম। পেঁপে, পাট ও রবারের জেনম সিক্যুয়েন্স আবিষ্কার করায় এদেশেই যার নামে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে আরও উল্লেখ করা যায় জাওয়াদ করিমের নাম। যিনি ইউটিউবের কো—ফাউন্ডার। কিংবা পেপ্যালের প্রধান ডিজাইনারও তিনি। ক্যান্সার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সুনাম পেয়েছেন ওহাইও ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সুলতানা এন নাহার। ক্যান্সার গবেষণায় অপর নাম ড. রায়ান সাদী। চিকিৎসা উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর যেমন উল্লেখযোগ্য সফলতা রয়েছে, তেমনি চিকিৎসা উদ্ভাবনেও তিনি সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশী—আমেরিকান এই চিকিৎসক বর্তমানে টেভোজেন বায়োর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সাশ্রয়ী ক্যান্সার ও জটিল সংক্রামক রোগের চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণে তাঁর অবদান তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিশেষভাবে সমাদৃত করেছে।
শিক্ষায় খান একাডেমির নামটা নিতে হবে। কারণ বিনামূল্যে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে দিতে সালমান খানের ভূমিকা সকলেরই জ্ঞাত। যুক্তরাষ্ট্রে ২২ বছর ধরে আমি নিজেও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের জীবন পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছি। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান পিপলএনটেক—এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে এই দেশের মূলধারায় প্রযুক্তি খাতে লক্ষ ডলার বেতনের চাকরি পেতে সহায়তা করেছি।
আমার শিক্ষা দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘Triple Missions: Degree, Skills, Career’ . আমি বিশ্বাস করি, শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়; সেই ডিগ্রির সঙ্গে বাস্তব দক্ষতা এবং কর্মজীবনের নিশ্চিত প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনকে সামনে রেখেই ২০২০ সাল থেকে চ্যান্সেলর ও চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচালনা করছি ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। আমাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, আমাদের শিক্ষকরা শুধু স্কলার নন, তাঁরা নিজ নিজ শিল্পক্ষেত্রের অভিজ্ঞ পেশাজীবীও। ফলে তাঁরা শ্রেণিকক্ষেই বাস্তব কর্মপরিবেশের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেন। শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করে না; তারা হাতে—কলমে বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পায়, শিল্পক্ষেত্রের সমস্যা সমাধান শেখে এবং কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর ফলে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী তাদের কর্মজীবন শুরু করতে পারে এন্ট্রি—লেভেল নয়, বরং মিড—লেভেল দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে।
এরই মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি ও বাস্তব দক্ষতা অর্জন করে সফল কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। কোনো বাংলাদেশীর নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রযুক্তি খাতে ইমরান খানের কথাও বলতে চাই। তিনি আরেকজন গর্বিত বাংলাদেশী—আমেরিকান, যার নেতৃত্বে আলিবাবা ও স্ন্যাপের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শুধু কি শিক্ষা প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান কিংবা আবিষ্কারে? আমরা এই দেশে অনেক বাংলাদেশী আমেরিকানকে দেখি যারা ব্যবসা ও বিনিয়োগেও সফল হয়েছেন। নাম কুড়িয়েছেন। মেডট্রোনিকের সাবেক সিইও কিংবা ইনটেলের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ইশরাক, গ্রামীণফোনের প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল কাদির কিংবা সেলবাজারের প্রতিষ্ঠাতা ও বিকাশের কো—ফাউন্ডার কামাল কাদিরও কিন্ত গর্বিত বাংলাদেশী—আমেরিকান।
একইভাবে বাংলাদেশী—আমেরিকান উদ্যোক্তা ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীর কথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একজন অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি পরবর্তীতে কেপিসি গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সফল বহুমুখী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে ২৫টিরও বেশি খাতে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, পাঁচতারকা হোটেল, বাণিজ্যিক উন্নয়ন, মেডিকেল কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চা—বাগান, জ্বালানি ও রিয়েল এস্টেটসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁর বিনিয়োগ বিস্তৃত। তাঁর দূরদর্শী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় বৃহৎ রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন এবং যুক্তরাজ্যে বাকিংহাম প্যালেসের বিপরীতে একটি পরিবেশবান্ধব গ্রিন টাউন নির্মাণ উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্য বাংলাদেশী—আমেরিকান উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক সক্ষমতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আর রাজনীতিতেও মূলধারার দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কেউ কেউ আমাদের সুপরিচিত। হ্যানসেন ক্ল্যার্ক প্রথম বাংলাদেশী আমেরিকান যিনি ইউএস কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। প্রতিনিধি সভায় মিশিগানকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁরই পথ ধরে হেঁটে জর্জিয়া স্টেট সিনেটে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে ৫ম ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন শেখ রহমান। তিনি জর্জিয়ার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম আইনপ্রণেতা এবং একজন গর্বিত বাংলাদেশী—আমেরিকান। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশী—আমেরিকানদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনসেবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের প্রথম বাংলাদেশী—আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন শাহানা হানিফ।
ভার্জিনিয়া স্টেট সিনেটে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন সাদ্দাম আজলান সেলিম। তিনি ভার্জিনিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে উঠে আসা একজন তরুণ ও প্রভাবশালী বাংলাদেশী—আমেরিকান নেতা। জনসেবা, কমিউনিটি অ্যাডভোকেসি এবং প্রতিনিধিত্বের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশী—আমেরিকানদের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
রাজনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন আবুল বশর খান। তিনি একজন গর্বিত বাংলাদেশী—আমেরিকান এবং নিউ হ্যাম্পশায়ার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সাতবার নির্বাচিত সদস্য। তাঁদের এই অর্জন বাংলাদেশী—আমেরিকানদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার নেতৃত্বে অংশগ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন আরও অনেকেই রয়েছেন যারা মূলধারার রাজনীতিতে অগ্রসর।
প্রথম বাংলাদেশী—আমেরিকান হিসেবে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আদালতের প্রথম ফেডারেল জজ নূসরাত জাহান চৌধুরী। অপর নির্বাচিত বিচারক হয়েছেন সোমা সাঈদ।
সাংবাদিকতা তথা সাহিত্যাঙ্গনেও রয়েছে কিছু নাম। যারা শীর্ষস্থানে চলে গেছেন। ম্যানহ্যাটান ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট রেহান সালামের কথা বলা যেতে পারে যিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রধানসারির প্রকাশন ন্যাশনাল রিভিউ’র সম্পাদকের পদ অলঙ্কৃত করেছেন। কিংবা বেস্ট সেলিং অথর হিসেবে লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ডের লেখক রুমন আলম, যার উপন্যাস অবলম্বনে নেটফ্লিক্স পরে চলচ্চিত্র বানিয়েছে। জয় উলফের কথাও বলতে চাই যিনি ইলেক্ট্রনিক মিউজিক আর্টিস্ট হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছেন। এছাড়া দ্য জার্কি বয়েজ কমেডি গ্রুপে স্থান করে নিয়েছেন কামাল আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্র নেভিতে প্রথম যে মুসলিম চ্যাপলেইনের নামটি যুক্ত হয় তিনি একজন বাংলাদেশী আমেরিকান আবুহেনা সাইফুল ইসলাম।
এছাড়াও অসংখ্য বাংলাদেশী আমেরিকান চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, উদ্যোক্তা তথা সরকারি সেবায় যুক্ত হয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কেবল নিউইয়র্ক পুলিশেই রয়েছেন ১০০০ এর বেশি বাংলাদেশী আমেরিকান যারা দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
আমেরিকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করছেন এমন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ—গবেষকের সংখ্যা হবে সহ¯্রাধিক। যারা তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে নিজেদের উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি ভূমিকা রেখে চলেছেন এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই রাষ্ট্রদূত এম. ওসমান সিদ্দিকের কথা। তিনি একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী—আমেরিকান, মার্কিন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক এবং লেখক। তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রদূত হিসেবে ফিজি, নাউরু, টোঙ্গা এবং টুভালুতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং প্রথম বাংলাদেশী—আমেরিকান, যিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক অর্জন শুধু বাংলাদেশী—আমেরিকানদের জন্যই গর্বের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদ, সমান সুযোগ এবং মেধার মূল্যায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশী—আমেরিকানরা কেবল ব্যবসা, শিক্ষা বা প্রযুক্তিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি ও জাতীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়েও নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় অসংখ্য বাংলাদেশী—আমেরিকান এই দেশে খুব ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন—কেউ একটি রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি স্টোর, কেউ একটি কনভিনিয়েন্স স্টোর, কেউ একটি গ্যাস স্টেশন বা ছোটখাটো খুচরা ব্যবসা নিয়ে পথচলা শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রম, সততা ও উদ্যোক্তা মানসিকতার মাধ্যমে আজ তাঁদের অনেকেই অসাধারণ সাফল্যের অধিকারী। এমন বাংলাদেশী—আমেরিকান উদ্যোক্তাও রয়েছেন, যারা এখন শতাধিক খুচরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁদের এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, করব্যবস্থা ও স্থানীয় কম্যুনিটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
সমানভাবে আশাব্যঞ্জক আমাদের নতুন প্রজন্মের সাফল্য। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী—আমেরিকান তরুণ—তরুণী হার্ভার্ড, ইয়েল, প্রিন্সটন, কলাম্বিয়াসহ আইভি লিগ ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি, স্ট্যানফোর্ডসহ বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হয়েছেন বা বর্তমানে সেখানে অধ্যয়ন করছেন। তাঁদের অনেকেই গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইন, ব্যবসা, জননীতি এবং সরকারি নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এসব বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলছেন এবং জ্ঞান—বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁদের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে বাংলাদেশী—আমেরিকান কম্যুনিটির অবদান শুধু আজকের আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়; আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উদ্ভাবন, নীতিনির্ধারণ এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আর যারা সাধারণ মানুষ। যারা এদেশে পাড়ি জমিয়ে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন এই দেশে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর যার সুফল ভোগ করছে কিংবা করবে। তাদের কথাও বলতে চাই। পৃথিবীর অর্ধেকটা পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশীরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে তাদের ঘাম—শ্রম ও মেধায় এদেশেরই অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছেন। তারা সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের গৌরব গাথার অংশীজন। তাদের সকলের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক শুধু একটি দেশের জন্মবার্ষিকী নয়; এটি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সুযোগের সমতা এবং ইমিগ্রান্টদের স্বপ্নপূরণের এক অনন্য ইতিহাসের উদ্। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশী—আমেরিকানদের অবদানও দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমাদের প্রথম প্রজন্ম সংগ্রামের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, দ্বিতীয় প্রজন্ম মূলধারার নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে, আর তৃতীয় প্রজন্ম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা, উদ্যোক্তা, শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জনসেবার মাধ্যমে আগামী দিনের আমেরিকা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অর্জন শুধু আমাদের গর্ব নয়, এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং যৌথ অগ্রযাত্রারও এক উজ্জ্বল প্রতীক।
শুভ স্বাধীনতা দিবস এবং শুভ জন্মদিন, আমেরিকা!
লেখক; প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও চ্যান্সেলর, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (www.wust.edu), প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, পিপলএনটেক (www.peoplentech.com)
