পিসিওএস নারীর হরমোনজনিত রোগ

অধ্যাপক ডা. নাদিরা সুলতানাঃ সারা বিশ্বে নারীরা প্রজননতন্ত্রের যেসব সমস্যায় ভুগে থাকেন, এর মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস অন্যতম। আমাদের দেশেও এই রোগে ভুগছেন লাখো নারী। পিসিওএস এক দীর্ঘমেয়াদি রোগ, থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন। তবে জীবনযাত্রার সঠিক পরিবর্তন, ওজন নিয়ন্ত্রণ সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এর উপসর্গ সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে দেখা দেয়, তবে অনেকেই বিয়ের পর গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিলে তবেই চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিস এমনকি এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সারের মতো শারীরিক জটিলতাও রোগ থেকে হতে পারে। অথচ আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব লাঘব করা সম্ভব।

কারণঃ সাধারণত কোনো একক কারণে পিসিওএস হয় না, কয়েক ধরনের সমস্যা সমষ্টিগতভাবে এই রোগটি সৃষ্টি করে। এর মধ্যে আছে

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা : দেহের মধ্যে নারী প্রজনন হরমোন, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টেরন, ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ) এবং লুটিনাইজিং হরমোনের (এলএইচ) ভারসাম্যহীনতা, পাশাপাশি দেহে অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন থাকতে পারে।

ইনসুলিন অসংবেদনশীলতা : রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ইনসুলিন হরমোন। অনেকের দেহে এই হরমোনটি ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রক্তে সব সময় অতিরিক্ত গ্লুকোজ রয়ে যায়।

অতিরিক্ত গ্লুকোজের প্রভাবে নারীদের দেহে তৈরি হয় অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন (অ্যান্ড্রোজেন), যা ডিম্বাশয়ের ক্ষতির কারণ।

জীবনযাপন : দেহের অতিরিক্ত ওজন, চিনি চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস, অনিদ্রা, ধূমপান অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শরীরচর্চার অভাব সরাসরি হরমোন ভারসাম্যহীনতা ইনসুলিন অসংবেদনশীলতার জন্য দায়ী হতে পারে।

জিনগত প্রভাব : পরিবারের অন্য সদস্যদের পিসিওএস থাকলেও ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিকট আত্মীয়ের কারো পিসিওএস থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা করা জরুরি।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ইনসুলিন অসংবেদনশীলতার যৌথ প্রভাবে ডিম্বাশয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ফলিকল তৈরি হয়, যা তরলে পরিপূর্ণ গোটা বা সিস্টের মতো হয়ে যায়।

এর ফলে ডিম্বাশয় থেকে অনিয়মিতভাবে ডিম্বাণু নির্গত হয়।

 উপসর্গ নারীরা সাধারণত নিম্নোক্ত উপসর্গগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থাকেন

ঋতুস্রাব বা মাসিক অনিয়মিত হলে। এটিকেই পিসিওএসের প্রধান উপসর্গ ধরা হয়।

হঠাৎ করে দেহের ওজন বেড়ে যাওয়া।

অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন; যেমনত্বকে ব্রণ হওয়া, মুখমণ্ডল দেহের অন্যান্য অংশে অবাঞ্ছিত লোম বেড়ে যাওয়া এবং মাথার চুল পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়া। 

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়া

গর্ভধারণে সমস্যা হওয়া।

রোগ নির্ণয়

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা জানতে চান রোগীর ইতিহাস শারীরিক উপসর্গ। পাশাপাশি কিছু প্রাথমিক পরীক্ষাও করা হতে পারে। রক্তে হরমোনের মাত্রাও পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে আছে সেরাম ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরন, এফএসএইচ এবং এলএইচ পরীক্ষা। পেলভিক আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষাও করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসাঃ পিসিওএস থেকে মুক্তি পেতে হলে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন

দেহের ওজন ঠিক রাখা। ক্র্যাশ ডায়েট না করে বরং সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। দৈনিক ফল, শাকসবজি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। 

প্রতিদিন ৩০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম এবং দৈনিক সাতআট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। ধূমপান অ্যালকোহল গ্রহণ বর্জন করতে হবে।

অনিয়মিত মাসিকের জন্য কিছু হরমোনাল ওষুধ ব্যবহার করা যায়। এর সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণে মেটফরমিন ওষুধও ভালো কাজ করে। যদি সন্তানধারণে সমস্যা হয়, তবে একজন বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্ভব। পিসিওএস রোগীদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এর চিকিৎসায় অবহেলা করা যাবে না।

পিসিওএসের প্রভাব শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে প্রভাব ফেলে তা না, এর প্রভাব পড়ে পরিবার, এমনকি সমাজেও। ফলে এটি একটি সামাজিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে, বিষয়টি আড়ালেই রয়ে গেলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রভাব রয়ে যাবে। তাই লজ্জা ভেঙে বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Related Posts