কবিতায় ভালোবাসা, ভালোবাসার কবিতা

গোলাপ

শামস আল মমীন


গোলাপের পাতা

শিশুর গালের মতো

                        নরম

কাঁটাগুলো হিংস্র

আহলাদি মেয়েদের খোপায় খোপায়

বসে থাকো তুমি

 

প্রেম কি আমার ঢিলেঢালা জামার বোতাম

হঠাৎ কোথাও খুলে পড়ে যাবে!

নিউইয়র্ক


তেলরঙে খোদাই করা আঁচড়

রাকীব হাসান


চোখের পলক গুনতে গুনতে আমি যোগফল শিখেছি

ফিরে তাকিয়েছিলে যেই দিকে

সেই সূর্যোদয়ের পূর্বরাগে চোখ মেলেছি —  

পিঠের সৌকর্য দেখতে এসে তার দেহের মানচিত্রে

সীমারেখা দেখতে পাইনি, আর এভাবে ভুগোলের ভুলে

হারিয়ে গেছি ঘাসের মহাদেশে

যেখানে পাখির ঠোঁটে আর্দ্র মেঘের গন্ধ


এখানে সেখানে পড়ে আছে তার খুনসুটি

পড়ে আছে ঝগড়াঅভিমান,

নদীর জল ভাসিয়ে নিতে পারেনি পা ধোয়ার ছায়া

হৃদয়ে জমা হয়ে আমার আছে ছায়ার রাজ্য

যখন কারো নাম ধরে ডাকি, ছায়া উঠে আসে

কারো দিকে তাকাতে চাইলে ছায়া ফিরে তাকায়


একটি পাতার কথা মনে পড়ে

যাকে ছুঁইতে গিয়ে ফুটতে দেখেছি

রাত্রির আজব অন্ধকারে জ্যোৎস্নার ছায়ায়

রঙ্গিন হয়ে ফুটেছে গন্ধের ছাঁচে অঙ্গের ভাঁজ।


আমার কেবল মনে পড়ে

প্রেমে পড়ে মরে যাওয়ার সেই বিষের রাত

জেগে আছে ফুলেফেঁপে ওঠার রেখাচিত্রের বাৎসায়ন,

আমাদের তেলরঙে খোদাই করা আঁচড় 

তীক্ষè হতে হতে আজও জলরঙে ধুয়ে যায়

মন্ট্রিয়েল



সিগাল আর স্যান্ড

লায়লা ফারজানা 


বুকের ভেতরে জমে গেছে

স্তুপিকৃত অটামলিভস

মৃত্যুর মত সহজেই ঝরে যায় যারা।


হয়তো একদিন মৃত্যুই নিয়ে যাবে 

অন্য কোন তারার কাছে।


মুখবন্ধ প্রেমপত্রের মত ছড়িয়ে আছে সিশেলেরা।

প্রতিভাঙনে বালিয়াড়ি,

বালুর প্রতিটি শস্যকণায় পৃথিবীর ইতিহাস।

মুছে ফেললাম আরও কিছু

সামুদ্রিক ঝিনুকের গল্প।


কিছু স্বপ্ন ধার নেয়া ছিল সমুদ্রের কাছে।

মুক্তাভিলাসী বালিগুলো তবুও দুআঙুলের ফাঁকে।

অনেক হলো সমুদ্রের ঠোঁটে কান পেতে 

শঙ্খঝিনুকের গান শোনা।

সমুদ্রে এসেছি আজ নিজেকে খালি করতে।


প্রেমিকসৈকত যায় কি ছেড়ে 

নীল সমুদ্রমানবীর হাত?

উপকূলে পায়ের ছাপ বারবার নিশ্চিহ্ন 

ফিরিয়ে দিই সমুদ্রকে তাই সেই ধার নেয়া স্বপ্ন।


সিমাথির মেটামরফিক সিল হতে চাইনা

হতে চাই অবাধ্য সিগাল

উপকূলে বসে শুনবো পাথর আর ঢেউয়ের বাহাস,

মিথিকাল অরায় হারিয়ে যাওয়া আত্মাদের অনুযোগ 

তবুও সমুদ্রে নামবো না।

নিউইয়র্ক









এক ঊর্বশী সন্ধ্যা

দর্পণ কবীর


এক ঊর্বশী সন্ধ্যায় তুমি এসে 

কবিতাশ্রিত রাতের গল্প বলেছিলে। 

মনে আছে? ওই সন্ধ্যাটাকে মনে 

হয়েছিল আমার ললাটের রাজ তিলক। 

ঐশ্বরিক নরম আলোর সন্ধ্যায় 

পৃথিবীর কোন মানুষ দীর্ঘশ্বাস ছাড়েনি, আকাশে 

মেঘ জমেনি, একটি নক্ষত্রও ঝরেনি!

কবিরা ওই সন্ধ্যায় পানশালা ছেড়ে

উপাসনালয়ে গিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে 

দুচোখ ভিজিয়েছে। 

সেদিনের সন্ধ্যাটি যেন রাতের আকর্ষণে 

মিলিয়ে না যায়, এই প্রার্থনায়

ধ্যানমগ্ন হয়েছিলাম আমি। ঈশ্বর হেসে 

আমাকে বলেছিল, বিচ্ছেদই প্রেমের মুকুট

আবার যদি কোনদিন ঐরকম সন্ধ্যা 

ফিরে আসে, আমি প্রেমের মুকুট ফেলে 

সন্ধ্যাটাকেই মুঠোয় ভরে নেব।

নিউইয়র্ক


বৃষ্টি

লালন নূর 


তোমার সাথে খুলতে পারি সাপের ঝাঁপি

তোমার সাথে রাতবিরাতে জীবন মাপি।


তোমার সাথে আকাশ ভেঙে 

                 কচুপাতায় বৃষ্টি নামাই;   


বৃষ্টি নামুক — 

তুমুল বৃষ্টি..

ওহাইয়ো


 






তাঁহারই কারণে

শামীম আজাদ


পাপ পুষ্পহারে মাথা পেতে 

হাড় খুলে নিদ্রাকরি প্রিয়

তব রাঙা বাহূমূলে 

তবু কী আশ্চর্য তফাতে


নিদ্রাকরি ঘাম কামকনা মেখে

বিদ্যুৎ বৈধতায়

তোমার চিবুকের চাপে

আনন্দ অভিঘাতে। 


আমি নিদ্রাবিষ্ট হই প্রতিরাতে 

জোনাকি অন্ধকারে

মাংসবৃক্ষ পুঞ্জে 

নিয়ত কলাবৃত্তে।


তোমারই কারণে বন্ধুৃ

শুধু তোমারই তরে।

লন্ডন


বাতাসি প্রতিশ্রুতি

মনিজা রহমান


তোমাকে ব্যবচ্ছেদ করেছি একাকী জনান্তিকে

যা দেখতে চেয়েছিলাম, না, তার কিছুই পাইনি 

কী যে দেখতে চেয়েছি দেখতে দেখতে তাও ভুলে গেছি।

আমার এমনই হয়, রোমন্থন হ্যাং হয় মোক্ষম সময়ে

কথা বলতে বলতে ভুলে যাই স্মৃতির পাসওয়ার্ড।


তবু  তোমাকে ব্যবচ্ছেদ করেছি এনাটমির ছাত্রীর মত

ঢুকে গেছি অলিতেগলিতে, আলোতে অন্ধকারে

                       স্বপ্ন স্মৃতি সেলাই করতে করতে

কিছুই পাইনি সেখানে 

                      না প্রেম না চুম্বন।

তুমি আকাশ দেখিয়ে বলেছ, ওটাই তোমার প্রেম


আমি আকাশে ঢুকতে চেয়ে হারিয়ে গেছি নক্ষত্রের ভিড়ে 

                     খুঁজে পাইনি প্রবেশ বা প্রস্থানের পথ 

কীভাবে জানব আকাশের ওপারে আকাশ

                              নাকি কেবলই বাতাসি প্রতিশ্রুতি?

নিউইয়র্ক





কুনিক তৃষ্ণায় 

জেবুন্নেছা জোৎস্না 


ভালোবাসা জল ছিলোতোমার স্বচ্ছ চোখে দেখি

ছায়া বালিয়াড়ি নদীপ্রতিবিম্বে তুমি আয়না

একই দ্রবণ জলে—  দুই মল্লা ভিন্ন স্রোতে

ফিরিয়ে দেয়া সহজ, তবু চলে যাওয়া যায়না


এক জীবন হরফেহৃদয়ের সিম্ফনি বাজে

লাব্ ডাব্ প্লবতায় দুঃখ নিলামে জাগে আশা

আমার গুল্ম দেহ তোমাতে পরগাছা জীবন

প্রেমজ বন্দনায়আমি আফ্রোদিতি, সর্বনাশা 


সময়ের দ্বার খুলে—  ডেকেছি তোমায় অসময়ে 

তুঁত পাতার লালায় রেশমের কোকুন অন্ত্রে

প্রাণের রূপান্তরেপ্রজাপতি ভালোবাসা ওড়ে

     হলদে সূর্যমুখী —  তন্তুর প্রণয় মন্ত্রে


বৃক্ষের সব পাতা ঝরে গেলেমরেছে হৃদয়

শুল্কপক্ষ শেষে অমাবস্যার কৃষ্ণায়

আমি সুমেরু শীতলে বলগা হরিণী চামড়ায়

এস্কিমো চুম্বনেতোমার কুনিক তৃষ্ণায় 


কোলাজের দিন শেষেথ্রেশহোল্ড হিমাংক রাতে

কায়ার আদলে ছায়া হাঁটে বিরান শূন্যতায়—  

গৃহস্থে ন্যাতানো প্রেমনিঃশ্বাসে পোড়া উত্তাপ 

জ্বালো তোমার আগুন নমস্য উপসনায় 

নিউইয়র্ক



সে 

রেজা শামীম


তার মুখ যেন নানাবাড়ির গ্রাম; বিষণ্ণ সুন্দর

ছাতিম ছায়ায় ঢাকা মেঠোপথ তার চোখ

ঠোঁটে পুকুরের পানির তিরতিরে অভিমান।


তার স্মৃতিবৃষ্টিদিনে খিচুরির গন্ধমাতাল

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস পালানো আড্ডামধুর

দূরের ক্যাসেট প্লেয়ারে ভেসে আসা উদাস গান

দিনের প্রথম চায়ের সাথে সিগারেটের অভ্যেস।


সে নিত্য ফিরে আসে আমার ঘোরে  

কলোনির খেলার মাঠের মত;  

আমার বয়স বাড়ে, এইভাবে—  

সে বরাবর রয়ে যায় একছেলেবেলাদূরে।

ক্যালিফোর্নিয়া


চুপকথা

ফারহানা হক 

মেয়েটি ছিল অদ্ভুত

কাগজ কলম কিছুই 

 লাগতো না তার। 

 কবিতা লেখার জন্য 

 পছন্দ ছিলো

 নিজের আঙুল। 


এবং ক্রমাগত বেছে নিতো

 ছেলেটির সুগঠিত কাঁধ, হাত

খোলা বুক, বাহু বা পিঠের আদুল

যতিচিহ্নের জন্য চিবুকের সুডৌল। 


সে সব কবিতা প্রকাশ করেছিল 

 জল জঙ্গল 

সম্পাদনা বিহীন

 দিব্যি অবিকল


মেয়েটি এখন শিখেছে আড়াল

হয়েছে নীল, চিনেছে মুখোশ 

 নিথর সব শব্দের খসখস 

আঙ্গুলে জড়ানো পুরু বল্কল


ছেলেটির বুকপকেটের ঠিক নিচে 

আজও জাগে, ছাই চাপা

লাভার আঁশটে জরুল।

নিউজার্সি








পুষ্পবিতান 

মুজিব ইরম 


হারিয়েছো নাকফুল জিপসি ফুলের ক্ষেতে শীতার্ত 

সকালে। আমিও হয়েছি চাষি কুয়াশার মাঠে। সখ 

করে বাগানবিলাস চারা করিয়াছি। তুমি রঙে রাঙ্গিয়েছি 

ঝাড়। তারাও ধরেছে বেশ মনের মতন। ডালিয়া 

ক্ষেতের পাশে আমাকে টানিছে খুব গাঁদাফুল। তোমার 

দেহের রঙে রাঙ্গা হলো মাঠ। চাই আমি তোমার উছিলা 

করে চাষ করি অচেনা অজানা ফুল। ভাবি আমি ভুলে 

যাবো চিরচেনা গোলাপের চাষ, ভিনদেশী বেগানা 

কুসুম। তবু তারা বিবিধ ভঙ্গিমা করে, নানা রঙে, নানা 

ছলে গোলাপের চাষি হতে বলে। ফুলের বাজারে যাই। 

দেশি বৈদেশি ফুল হাটে তুলে আনি। তুমি কি আসবে 

না আর ফুলের বাজারে? কিনবে না অধম চাষির ফুল

আবেগ আকুল? শীত যায় শীত আসে। মনোবাঞ্ছা 

বাড়ে। কাটে দিন হাটে আর মাঠে। খুলিবো তোমার 

নামে ফুলের দোকান গদখালি হাটে।

লন্ডন




বিভ্রান্তি

নাহার মনিকা


আমার সংগে ত্বক হয়ে মিশে থাকো

রোদে পুড়ে, খুব করে ছায়া থেকে দূরে 

না দেখেও চাক্ষুসের নেশা,

নীল হতে চাওয়া জলাধার

তুঙ্গ ঢেউয়ের সাধ হৃদপিণ্ডে আঁকোৃ। 

এইসব সিম্বলিক, বুঝেও বুঝিনি


আমাকে ভোলার জন্য, এমন অসার

বনজ ফুলের মত মেলে দেয়া বুকে

বেলাভূমি খুঁটে খাওয়া পাখিদের ঠোঁট

অলীক বিভ্রমে ওড়ে,

নেমে আসে জলে, নীলে ভেসে যায়,

এইখানে কোথা থেকে সে চলে আসে,

আমাকে ভুলিয়ে দিতে থেকে যায় সেও।


ঘুম আর স্বপ্নের মাঝখানে জেগে

বিরহের গান বাজে আকাশের ভাঁজে,

তুমিই আবার ত্বক হয়ে সেঁটে থাকো

মেঘে ভিজে। 

সে শুধু ভাঙ্গা রোদে একা ফিরে যায়। 

মন্ট্রিয়েল


সন্তপ্ত ধূলিগান

রওশন হাসান


কিছু কিছু দৃশ্যান্তরে দিগন্তের সুদূরতা ক্রমশ 

মিলিয়ে যায় 

অথবা ভেজা ভেজা দিনে অভ্যন্তরের ঘ্রাণে

নিজেকে খুলে দিতে চায় ঝিনুকের মত;

কোরকে কোরকে আকাঙ্খা জাগে রৌদ্রঋতুর 

ভরসাস্থলগুলো ক্রমাগত সংকীর্ণ হতে থাকে যাবৎ 

সফেদ দানাদার দিনান্তে

কী এক উৎকন্ঠায় জমাট সন্ধ্যা করুণ কোরাস 

গেয়ে ওঠে আঙিনাজুড়ে

তবুও বিরুদ্ধ বাতাসে দ্বন্দ্ব ভেদ করে

হিম অরণ্য, উপত্যকা পেরিয়ে কিছু ভালোবাসা 

পাশে এসে বসে একান্তে

যে হৃদয়মনেই বসবাস সুখবিষাদের চরাইউৎরাই

নিশ্চিতি, সংশয়, ভঙ্গুর আকাঙ্খাজর্জর অস্থির 

মৃত্যুর ঘেরাটোপ।


তোমার আকাশে আমি নীলাভরশ্মি হয়ে আছি

দীর্ঘকাল

কাচের শার্শিতে ক্ষীণায়ু চাঁদ 

ব্যাঘাত পেয়েও রেখে যায় চিহ্নআলোক 

ক্বচিৎ ক্ষান্তিতে। 

কী এক উৎফুল্ল চাহনিতে জেগে ওঠে 

সকাল সবিনয়ে

শূন্যকে লেহন করে পথের কিনারে শেকড়ে দাঁড়িয়ে পত্রহীন সনাতন বৃক্ষসমূহ;  

ফুল কীটের অভীপ্সায় কী প্রবল রোমাঞ্চ জাগে লিরিক্যাল রোমে রোমে।

নিউইয়র্ক


ভালোবাসা: একটি দীর্ঘ বাক্য 

বেনজির শিকদার 


আজকালকার প্রেমিকরা দলবেঁধে আসে দুঃখ দিতে

আপ্ত আপন আধিক্যে পাবলো নেরুদার পাতা উল্টাই;

পাশেই লর্ড বায়রন, ভিক্টর হুগো

আলেকজান্ডার পুশকিন প্রবল পরিখার জীবনানন্দ।

স্বজন সকাশে প্যান্টোমাইমের মতো

সুনীলেরকেউ কথা রাখেনিউচ্চারণ করতেই; ওরা দূরে সরে যায়।


প্রমিত প্রেম, উষ্ণ প্রত্যয় কিংবা আত্মগত আধার 

একযোগিতার অনুভূতিতে 

চোখের কোটরে গুমরে মরা রাতের নোনা;

এইসব নেপথ্যজীবনের সিন্দুকে জমা রেখে,

প্রভুভক্ত কুকুর হয়ে ভালোবাসা নামক বিষের বাহনে চড়েছি।


আজকালকার প্রেমিকরা দলবেঁধে আসে দুঃখ দিতে

শনৈ: শনৈ: সন্তাপে আওড়াই— 

ভিন্টেজ মন আমার; রেট্রো স্টাইল সত্তায়

পূর্বপুরুষদের মতো আবারও প্রেমে পড়েছি!

নিউইয়র্ক


Related Posts