২৮ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কে || বেন সম্মাননা পেলেন ড. নজরুল ইসলাম

বিশেষ প্রতিবেদনঃ পরিবেশ রক্ষা এখন আর কেবল একটি সামাজিক বা উন্নয়নমূলক ইস্যু নয়, এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর এই সংগ্রামে যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন, তারা একেকজন পরিবেশ যোদ্ধাÑ এমন দৃঢ় প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন)—এর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। গত ১৮ জুলাই নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসের জুইশ সেন্টারে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং টেকসই পরিবেশ আন্দোলনে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বেনের প্রতিষ্ঠাতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ লেখক . নজরুল ইসলামকে আজীবন সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।

এই উপলক্ষে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থে তাঁর চিন্তা, নেতৃত্ব উঠে এসেছে বিভিন্ন লেখায়। তাঁকে সম্মাননা জানিয়ে. নজরুল ইসলামপরিবেশ পথিকৃৎ’ (উৎ. ঘধুৎঁষ ওংষধসঅহ ঊহারৎড়হসবহঃধষ চরড়হববৎ) শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২৪ জন বিশিষ্ট লেখকের প্রবন্ধ, মূল্যায়ন স্মৃতিচারণ নিয়ে সংকলিত , গবেষণা এবং পরিবেশ আন্দোলনে অবদানের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। গ্রন্থটি সম্পাদন করেন বিশিষ্ট গল্পকার রাজিয়া নাজমী। উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন দীপেন ভট্টাচার্য। 

অনুষ্ঠানে বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী . মুহম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা যেমন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তেমনি বাংলাদেশ প্রবাসে যারা পরিবেশ রক্ষায় নিরলস সংগ্রাম করছেন, তারাও একেকজন পরিবেশ যোদ্ধা। তিনি বলেন, গত ২৮ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু হওয়া বেনের কার্যক্রম এখন বাংলাদেশ, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়েছে। মানবতার কল্যাণে পরিবেশ রক্ষার এই আন্দোলন ভবিষ্যতেও আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশমুখে পরিবেশ সংরক্ষণের আহ্বানসংবলিত পোস্টার, প্ল্যাকার্ড এবং শিশুকিশোরদের আঁকা চিত্রকর্ম দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 

বেনের নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি কানেকটিকাট চ্যাপ্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমকর্মী বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রবাসী বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নতুন প্রজন্মের পরিবেশবিষয়ক নৃত্য, সংগীত আবৃত্তি অনুষ্ঠানকে এক অন্য মাত্রা দেয়।পরিবেশ প্রাণ, নির্মল পরিবেশসুন্দর জীবন’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বক্তারা বর্তমান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, সবুজ নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বেন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে গত প্রায় তিন দশক ধরে . নজরুল ইসলামের পরিবেশ আন্দোলনে নেতৃত্ব, গবেষণা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর অবদানের চিত্র তুলে ধরা হয়। আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করে . নজরুল ইসলাম বলেন, মানুষ বলে কাছের মানুষ সম্মান দেয় না, দূরের মানুষই সম্মান করে। কিন্তু আজকের এই আয়োজন সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। আপনজনদের এই ভালোবাসা স্বীকৃতি আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সমাজচিন্তক . রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, নদী জলাশয় রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের প্রশ্নে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হবে। তাই পরিবেশ রক্ষা এখন বৈশ্বিক দায়িত্ব। 

বিশেষ অতিথি প্রফেসর রওনক জাহান বলেন, . নজরুল ইসলাম পরিবেশকে কেবল গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের জীবন, সমাজ ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক দেশেবিদেশে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। 

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন . সালেহ তানভীর, . দীপেন ভট্টাচার্য, হাফিজুল হক, অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক রানা ফেরদৌস চৌধুরী, গল্পকার রাজিয়া নাজমী, সাপ্তাহিক ঠিকানার সাবেক প্রধান সম্পাদক এম ফজলুর রহমান, অধ্যাপক হুসনে আরা, বেনের কানাডা চ্যাপ্টারের আহ্বায়ক টিটু খন্দকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদুল ইসলাম, প্রগ্রেসিভ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বাচ্চু, রানু ফেরদৌস, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক কল্লোল দাশ, সহ সাধারণ সম্পাদক হিরো চৌধুরী, অনুষ্ঠানের সদস্যসচিব ইফজাল চৌধুরী, আবুল কাশেম দেলোয়ার চিত্রশিল্পী এম ডি টোকন। 

বক্তারা বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো একটি সংগঠনের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক সামাজিক দায়িত্ব। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে এখন থেকেই সবাইকে সচেতন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

সাবিনা হাই উর্বির প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেন নাট্যশিল্পী শিরীন বকুল, আবৃত্তিশিল্পী মুনমুন সাহা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পী আলভান চৌধুরী লিয়ানা মানহা। উদ্বোধনী সংগীতে অংশ নেন . সবিতা দাসের নেতৃত্বে বহ্নিশিখা সঙ্গীত নিকেতনের শিল্পীরা। এছাড়ামাটির গান’—এর শিল্পী মো. শাহীন হোসেন, খ্রিস্টেলা কুইয়া, খালেদা পারভীন, তুলি বিশ্বাস, মহুয়া ভট্টাচার্য মলি দেসার পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। তবলায় সংগত করেন দেবু চৌধুরী, ঢোলে শফিক মিয়া, কিবোর্ডে রবিউল ইসলাম, অক্টোপ্যাডে মিনহাজ আহমেদ সাম্মু এবং পারকাশনে সুমন।

Related Posts