যেসব কারণে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
ডা. মো. আহাদ হোসেনঃ আমাদের পুরো শরীরের নিয়ন্ত্রণ মেরুদণ্ডের সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। সে হিসেবে এটি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের পুরো শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে এই মেরুদণ্ড। আর তাইতো মেরুদণ্ডের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের পুরো শরীরেই ব্যথা হয়।
স্বাভাবিক নড়াচড়া এবং চলাফেরাও কষ্টদায়ক হয়ে যায়। মেরুদণ্ড সমস্যাগ্রস্ত হলে যে বিষয়টি প্রথমেই পরিলক্ষিত হয়, সেটি হচ্ছে ব্যাকপেইন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অনির্দিষ্ট ব্যাকপেইন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোকের হয়ে থাকে। এই ব্যাকপেইনের অন্যতম প্রধান কারণ মেরুদণ্ডের সমস্যা। আবার এই মেরুদণ্ডের মধ্য দিয়েই আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু সারা শরীরে বিস্তৃত থাকে। মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই স্নায়ুর ওপরেও চাপ পড়ে, যার কারণে আমাদের ব্যথাসহ অন্য অনেক সমস্যা হতে পারে। তাই মেরুদণ্ডের যত্ন নেওয়া এবং যেসব কাজ করলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলো থেকে সাবধান থাকাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মেরুদণ্ডের গঠন
প্রথমেই মেরুদণ্ডের গঠন সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার। মেরুদণ্ড মূলত বিভিন্ন ধরনের কশেরুকা, মাংসপেশি, লিগামেন্ট এবং কশেরুকার মধ্যবর্তী নরম জেলির মতো পদার্থ বা ডিস্কের সমন্বয়ে গঠিত। দুটি কশেরুকার মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা দিয়ে বের হয় আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো। এগুলোর কোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারসাম্য হারাতে পারে মেরুদণ্ড। আবার কশেরুকা, মাংসপেশি, লিগামেন্ট এবং ডিস্ক—এগুলোর সজীবতা রক্ষা করার জন্য দরকার সঠিক রক্ত চলাচল ব্যবস্থা। কোনো কারণে ডিস্কের ওপরে চাপ পড়লে সেটি পরবর্তী সময়ে আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর ওপরে চাপ প্রয়োগ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে। যেহেতু কশেরুকা একটি হাড়, সেহেতু এটির সঠিক গঠন বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’র প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এগুলোর অভাবেও কশেরুকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা ভঙ্গুর হতে পারে। সাধারণত অস্টিওপোরোসিস রোগে এটি ঘটে থাকে। যাদের অস্টিওপোরোসিস থাকে, তাদের রক্তে ভিটামিন ‘ডি’ ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কম থাকে, যে কারণে কশেরুকায় সঠিক মাত্রায় ক্যালসিয়াম থাকে না। এ ছাড়া অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা মুভমেন্টের কারণে লিগামেন্টস ও মাংস বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হঠাৎ করে অত্যধিক ভার বহন করার কারণেও আমাদের মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যেসব কারণে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
● আঘাতের কারণে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
● মেরুদণ্ডে কোনো টিউমার হলে অথবা অন্য জায়গার কোনো টিউমার মেরুদণ্ডে এলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
● ডিজেনারেটিভ ডিস্ক ডিজিজ হলে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
● জন্মগত অথবা অন্য কোনো কারণে মেরুদণ্ড অস্বাভাবিক বাঁকা হয়ে গেলে।
● মেরুদণ্ডের কশেরুকা হাড় একটির ওপর আরেকটি উঠে গেলে মেরুদণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
● রিউম্যাটয়েড আথ্রর্াইটিস অথবা অন্য কোনো কারণে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁকা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যেটিকে বলা হয় স্পন্ডিলোসিস।
● যারা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভার বহনের কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
● যারা দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করে, তাদের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এই ক্ষতিগ্রস্ত ডিস্ক এটির স্বাভাবিক জায়গা থেকে বের হয়ে এসে আমাদের শরীর নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুকে চাপ দিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
● যারা অস্টিওপোরোসিস সমস্যায় ভুগে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে যেকোনো সময় মেরুদণ্ড হালকা ভাঙার আশঙ্কা থাকে।
