শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য || ড. কালিদাস ভক্ত
পরম ঈশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, আমাদের প্রাণের দেবতা। তিনি ভাদ্র মাসের জন্মাষ্টমীর মহাতিথিতে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তাই জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই পৃথিবীর সবকিছুর তিনি স্রষ্টা, সর্বশক্তিমান, নিরাকার, বিষ্ণুর অবতার। তবে নিরাকার হলেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যেকোনো আকার ধারণ করতে পারেন। তিনি বিশ্বকার্যের জন্য অপ্রপঞ্চ হতে প্রপঞ্চে আবির্ভূত হন। তিনি চিন্ময় জগৎ থেকে অবতরণ করেন। আর এই অবতরণের অর্থ হচ্ছে— কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভগবানের স্বেচ্ছায় সাকাররূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া। যখন পৃথিবীতে চরম খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাস্ত হয়, সমাজে বিরাজ করে চরম বিশৃঙ্খলা, তখন ঈশ্বর স্বয়ং পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য। আবির্ভূত হয়ে তিনি পৃথিবী থেকে সব অশান্তি দূরীভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
মথুরার রাজা ছিলেন কংস। তিনি তাঁর বাবা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে রাজা হন। কংসের জেঠতুতো বোন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মা দেবকী। কংস দেবকীকে শূর বংশের রাজা বসুদেবের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের পর তিনি নিজে রথে করে দেবকী ও বসুদেবকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন।
এমন সময় আকাশে দৈববাণী হলো—‘ওরে নির্বোধ! যাকে তুই রথে করে নিয়ে যাচ্ছিস, তার অষ্টম গর্ভের সন্তান তোকে হত্যা করবে।’ দৈববাণী শুনে কংস অত্যন্ত বিচলিত হয়ে রেগে গেলেন। তিনি তখনই খড়্গ নিয়ে দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু বসুদেব তাঁকে নিবৃত্ত করলেন। তিনি কথা দিলেন যে তাঁদের সব সন্তানকে তিনি কংসের হাতে তুলে দেবেন। এ কথা শুনে কংস নিবৃত্ত হলেন। কিন্তু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেবকী ও বসুদেবকে কারাগারে আটকে রাখলেন। কংস একে একে তাঁদের ছয়টি সন্তানকে হত্যা করলেন। সপ্তম সন্তান বলরাম সংকর্ষণের মাধ্যমে বসুদেবের অপর স্ত্রী রোহিনীর গর্ভে স্থানান্তরিত হলো। এবার অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি রাতটি ছিল ভীষণ দুর্যোগময়। সব প্রহরী যোগমায়ার প্রভাবে ঘুমে আচ্ছন্ন। দৈবনির্দেশে বসুদেব সদ্যোজাত পুত্র শ্রীকৃষ্ণকে গোকুলে নন্দরাজপত্নী যশোদার পাশে শুইয়ে রেখে তাঁর সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে এলেন এবং দেবকীর কাছে সমর্পণ করলেন। পরদিন ভোরবেলায়ই কংস অষ্টম সন্তানকে হত্যা করতে চলে এলেন। কন্যাশিশুটিকে আছাড় মারার জন্য যেই ওপরে তুললেন, অমনি সে ওপর দিকে চলে গেল। আর যেতে যেতে কংসকে বলল—‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।’ তিনি স্বয়ং বিষ্ণুরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। কংস ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি তাঁর বোন পুতনা রাক্ষসীকে পাঠালেন গোকুলের সব শিশুকে বিষাক্ত স্তন পান করিয়ে হত্যা করতে। শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পেরে এমনভাবে পুতনার স্তন পান করলেন যে পুতনা পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হলো। কংস বুঝতে পারলেন যে শ্রীকৃষ্ণই তাঁর শত্রু। তিনি নানাভাবে শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। যত দিন যাচ্ছিল, শ্রীকৃষ্ণের লীলা ততই প্রকাশ পাচ্ছিল সবার কাছে। কংস কোনোভাবেই শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করতে পারছিলেন না। পরে তিনি মল্লযুদ্ধের ব্যবস্থা করলেন। তিনি অক্রুরকে পাঠালেন শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামকে আমন্ত্রণ জানাতে। অক্রুর তাঁদের জানালেন এবং সেই সঙ্গে কংসের গুপ্ত অভিসন্ধির কথাও জানালেন। শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম মথুরায় এলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কংসের মল্লযোদ্ধারা প্রস্তুত ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের সবাইকে পরাজিত করলেন। শেষে শ্রীকৃষ্ণ কংসের চুলের মুঠি ধরে মঞ্চ থেকে নামালেন এবং মুষ্টির আঘাতে তাঁকে বধ করলেন। শ্রীকৃষ্ণ বাবা বসুদেব ও মা দেবকীকে মুক্ত করলেন। পরে দাদু উগ্রসেনকে মুক্ত করে মথুরার রাজা করলেন। এরপর অত্যাচারী জরাসন্ধকে বধ করেন। জরাসন্ধ ছিলেন কংসের শ্বশুর। কংসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়ে মথুরা আক্রমণ করেন। কিন্তু তিনি পরাজিত ও বন্দি হন। বলরাম তাঁকে হত্যা করতে চাইলেও শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন। কিন্তু তিনি আরো সাতবার মথুরা আক্রমণ করলেন এবং প্রতিবারই পরাজিত হলেন। পরে শ্রীকৃষ্ণ ভীমকে দিয়ে তাঁকে হত্যা করলেন। তারপর শিশুপালকে বধ করেন। কারণ চেদিরাজ শিশুপাল ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী ও অত্যাচারী। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মাকে কথা দিয়েছিলেন যে তাঁর ১০০ অপরাধ ক্ষমা করবেন। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ভীষ্ম শ্রীকৃষ্ণকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে অর্ঘ্য প্রদান করেন। শিশুপাল এতে ঈর্ষান্বিত হন। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নিন্দা করতে শুরু করলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কথামতো শিশুপালের ১০০ অপরাধ আগেই ক্ষমা করেছিলেন। এবার তিনি সুদর্শন চক্র আহবান করে শিশুপালের মস্তক কেটে ফেললেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরের রাজসভায় সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। কিন্তু দুর্যোধন প্রত্যাখ্যান করল। ফলে কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল। দুই পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ হলো। উভয় পক্ষের অনেক মানুষ ও বহু যোদ্ধা নিহত হলো। শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষ জয়লাভ করল। ধর্মপ্রাণ পাণ্ডবরা হারানো রাজ্য ফিরে পেলেন। এরপর কুরুক্ষেত্রের মহাপ্রান্তরে শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত অমীয় বাণী শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মোহ দূর করার জন্য তাঁকে ধর্মের সারকথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ কর্ম—জ্ঞান—ভক্তির অমিয় বাণী শোনালেন এবং বিশ্বরূপ দর্শন করালেন। এর ফলে অর্জুনের মোহ দূর হয়ে প্রজ্ঞা—বারিতে সিক্ত হলেন। তিনি যুদ্ধে অংশ নিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে বর্ণিত ধর্মের সব মর্মার্থই হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। পরবর্তী সময়ে শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সম্পন্ন করে দ্বারকার রাজা হলেন। সেখানে তিনি আদর্শ রাজা হিসেবে বহুকাল রাজত্ব করলেন। তারপর নশ্বর দেহ বিসর্জন করার সংকল্প করলেন। তিনি বনে গমন করে একটি অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে বসে আছেন, তখন জরা নামে এক ব্যাধ তাঁকে মৃগ মনে করে তাঁর চরণে তীর বিদ্ধ করল। এই শরাঘাতে শ্রীকৃষ্ণ ইহলীলা সংবরণ করলেন। তাই শুভ তিথিতে মহিমাময়ের জীবন ও বাণীতে উদ্ভাসিত হোক সবার মন, জন্মাষ্টমীর এই আলোক প্রভায়। আহবান হোক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রকাশ। তাই ভক্তকান্ত হৃদয়ের প্রার্থনা— হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতে।/গোপেশ গোপীকাকান্ত রাধাকান্ত নমহস্তুতে\ অর্থাৎ, হে পরম দয়াময় শ্রীকৃষ্ণ, করুণার সাগর, অসহায় ও আর্তমানুষের একমাত্র বন্ধু, নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের স্বামী, হে গোপগণের ঈশ্বর, গোপীগণের প্রাণপ্রিয়, শ্রীরাধার হৃদয়েশ্বর আমরা ভক্তিভরে প্রণাম জানাই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
