একটি ইতিহাসের সমাপ্তি

পঞ্চাশের দশকে সেই সময়ের পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে তারকা রাজনীতিকদের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছিলেন ছাত্ররাও। ভাষা আন্দোলন বাংলার ইতিহাসে এমনই মহার্ঘ একটি ঘটনা। সেই সময় রাজনীতিকরা এবং ছাত্ররা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর মুখেমুখি দাঁড়াতে ভয় পেত, তাহলে বাঙালির ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। পঞ্চাশের দশকে শেরেবাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীদের মত নেতাদের পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। মূলত তাকেই বরাবর সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসন এবং মিলিটারি শাসকরা। কেবল অকুতোভয় সাহস, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ও প্রজ্ঞার কারণে ষাটের দশকে সকলকে ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্থান ছিল বিস্ময়কর। এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খানের লেলিয়ে দেয়া কিছু ছাত্র যাদের ব্যানারের নাম ছিল এনএসএফ বা ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্রদের রুখতে চাইলে যে লড়াই শুরু হয়, সেই লড়াইএর মাঠ থেকেই ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের উত্থান। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত যুগান্তকারী ৬ দফা দাবির সাথে আরো ৫ দফা মিলিয়ে ছাত্রনেতারা ১১ দফা ঘোষণা করেন। এই ৬ ও ১১ দফার দাবিই শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের স্বাধীনতা চৌকাঠে তুলে দেয়।

ভাষা আন্দোলনে যেমন সেই সময়ের ছাত্ররা অগ্রগামী ছিলেন, ষাটের দশকে ১১ দফা আন্দোলনের লড়াইএ, সরকারি পেটোয়া ছাত্রবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে, ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ বই বাতিলে (পাঠ থেকে) ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ষাটের দশকে সেইসব ছাত্রনেতাদের চিনতেন আপামর দেশবাসী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জান্তারা। যেহেতু সেই সময় বঙ্গবন্ধুকে বারবার কারাগারে নেয়া হতো, তাই ছাত্রদের একটি খুব জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’। সত্যি সত্যি অত্যন্ত আট-ঘাট বেঁধে আইয়ুবের আইনজীবীরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে আটক করেছিল বঙ্গবন্ধুসহ তার সতীর্থদের। ঢাকার কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে সেই মামলার বিচারও শুরু হয়েছিল। কিন্তু মামলা চলাকালেই উক্ত মামলার আসামী অবস্থায় বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হলে (১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯) পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বলে ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ ২৭ জনকে মুক্তি দেয়। ঐদিনই বিশাল জনসভায় তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেন।

এই উপাধি বঙ্গবন্ধুকে দেশের বিভিন্ন নগরী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল মানুষের কাছে বাংলার বন্ধু হিসাবে দাঁড় করাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধু-বিরোধী কিছু মানুষ ছাড়া সকলের কাছে তিনি বঙ্গবন্ধু নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের আগে পর্যন্ত তাকে আর কারাগারে নিতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকরা। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তরুণ ছাত্রনেতারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ঢাকায় এসে এই তরুণ নেতাকে তাঁর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তোফায়েল আহমেদের সামান্য পরে আরো ছাত্রনেতা এসেছে, যাদের চার খলিফা বলা হয়েছে। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের আগে থেকে তারা খ্যাতি অর্জন করেন। আদর করে এই চার নেতাকে ৪ খলিফা বলারও কারণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ময়দানেই এই চার নেতার মধ্যে দুইজন মতানৈক্যের কারণে বঙ্গবন্ধুকে ত্যাগ করে তারই বিরোধিতায় নামেন। দুইজন রাজনীতিতে আর তেমন সক্রিয় থাকেননি। কিন্তু তোফায়েল আহমেদকে রাজনৈতিক সচিক নিয়োগ দিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন ছাত্রনেতাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বিচক্ষণ।

সেই তোফায়েল আহমেদ কোনোদিন মৃত্যুর আগে বা মৃত্যুর পরে বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে যাননি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তিনি মুজিব কোট খুলে খুনি মোশতাকের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেননি। বরং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামানসহ অন্যদের সাথে। তিনি ৩৩ মাস জেলে ছিলেন। ক্ষমতা হারানোর ২১ বছর পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়, তাতে দলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে যাদের ভূমিকা ছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাদের অন্যতম।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এবং ফখরুদ্দীন আহমদ ক্ষমতা দখল করে শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তারেক রহমানকে মেরে ফেলার লক্ষ্যে প্রচন্ড নির্যাতন করা হয়। আর দুই নেত্রীকে মাইনাস করার অপচেষ্টা হয়। দুই দলেরই শীর্ষ নেতাদের ভাগিয়ে নিয়ে নতুন আওয়ামী লীগ ও নতুন বিএনপি গড়ার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু হয়। হাসিনাকে বাদ দিয়ে যারা নতুন আওয়ামী লীগ গড়ার টোপ খায় তাদের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সেনা নিয়ন্ত্রিত ফটো আইডিসহ ভোটার লিস্টে যে নির্বাচন হয়, তাতে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে এই সব নেতারা দলে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। কিন্তু এরপর ২০১৪ সালে তিনি মন্ত্রিত্ব পেলেও এবং দলে অনেকটা গুরুত্বহীণ হয়ে পড়েন। তা সত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ আমৃত্যু কোনোদিন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো উষ্মা প্রকাশ করেননি। তিনি ষাটের দশককে, আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর এবং ছাত্রদের আন্দোলনকে যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তারিখসহ বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন তা অনেকের জন্যই দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

তোফায়েল আহমেদের যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর দেখা যায়নি। ভবিষ্যতে আবার কবে দেখা যাবে সে বিষয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করা দুরূহ। কারণ বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পর থেকে নতুন তুখোড়, প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথ বন্ধ হয় বলেই ২০২৪ সালে অন্য ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করে জ্বালাও পোড়াও করে, জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করার আগে বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য ভাঙা, ভাষা শহীদদের ভাস্কর্য ভাঙা, বঙ্গবন্ধুর চিহ্ন মুছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সব চেতনা নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে যার ‘মেটিকিউলাস’ প্লানে এইসব ঘটেছে, তিনিই স্বীকার করছেন তাদের ভুলের কথা।

তোফায়েল আহমেদ একজনই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকার জন্য তাকে বাঙালি জাতি বহু বহু দিন স্মরণ করবেন।

Related Posts