যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৩ সবাই সমান? মনিরুল ইসলাম
সমতার যত শ্রেণীবিভাজনই করি না কেনÑ জন্মগত, আইনগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, শারীরিক, মানসিকÑএই পৃথিবীতে কোনো ধরনের সমতাই নেই। যেমন নেই শ্রেণীহীন গোষ্ঠী বা বৈষম্যহীন সমাজ। ভূমন্ডলের ৮০০ কোটি মানুষ ৮০০ কোটি ধরনের। তাদের কিছুই সমান নয়, সবাই ভিন্ন অনন্য অসমান। অবশ্য নিজ কর্মই মানুষকে বড়—ছোট করে। মানুষকে সমান করা যায় না, মানুষদের কেউ কেউ আপনা—আপনি ওপরে উঠে যায়, উঠায় না। একই ধরনের ব্যবসা শুরু করে কেউ তরতর করে মহাধনী হয়ে যায়, আর কেউ পড়ে থাকে তলানিতে, অথবা দেউলিয়া। কেউ হয় মহাবীর আলেকজান্ডার, মহাপন্ডিত সক্রেটিস, মেধাবী বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বা পরাধনী বিল গেটস। কেউ রয়ে যায় দীনহীন ভীতু যদু মধু কদু। কেন হয়? আমি মনিরুল ইসলাম হলামÑএর বেশি নয়, কম নয়। কারণ, প্রকৃতি আমার বরাতে তা—ই দিয়েছে, এইটুকু নিয়েই যেন আমি শান্ত তৃপ্ত থাকি।
বড়জোর বিকাশের জন্য থাকতে পারে সবার সমান সুযোগ (ষবাবষ ঢ়ষধুরহম ভরবষফ), মৌলিক চাহিদা পূরণে থাকবে সমানাধিকার। তবে এসবই গরিব দুর্বল অসহায়দের জন্য সান্ত্বনার কথা। কারণ সেটাই বা কীভাবে সম্ভবÑধনীর ও গরিবের সন্তান বিকশিত হবার পরিবেশ/সুযোগ সমান পায় না। জীবন একটা সুযোগ বা চান্স—এর ওপর নিমীর্য়মান/চলমান নাটক, যার সাফল্যের মাত্রা ও পরিমাণ নির্ভর করে পারিবারিক ও পারিপাশি^র্ক সুযোগের ওপর। যদিও বলি, অমুকে আমারই মতো, আসলে প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু আমার মতো, কিছু না কিছু আমার চেয়ে ভিন্ন। সবকিছু এক, আবার কত ভিন্ন। সমতা নয়, অসমতাই সমাজের ভারসাম্যতা রক্ষা করে।
শেষরাতে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে। চোখের পাতা বন্ধ রাখলেও মন—মস্তিষ্কের সব দরজা জানালা খুলে দিয়েছি, বড় কোনো ভাবনা এসে ধরা দেবে এই আশায়। না, আমি যতই চেষ্টা করি, আমার মধ্যে মহামানবীয় ভাবনা সঞ্চারিত হয় না। আমি সক্রেটিস, বেটোভেন, রবীন্দ্রনাথ হতে পারি না। আমার নীচে যারা অবস্থান করছে, তারাও আমার পর্যায়ে উঠে আসতে পারছে না। এই যে স্তরে স্তরে সাজানো মানুষের মেধাবুদ্ধি চিন্তাশক্তি, মহাবিশ্বের সৃষ্টিকুলÑতার কারণ কী? অনেক রহস্যের বেড়াজাল মানুষ ভেদ করতে পারে না।
বৈচিত্র্য একটি প্রাকৃতিক বিষয়, যা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। জোর করে চাপিয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক সমতা আনা যায় কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে ফিজিবল হবে না। প্রকৃতির বিধানই হল অসমতা, একে সবলে পরিবর্তন করতে যাওয়া মানেই হল কৃত্রিম ব্যবস্থা নেয়া, যা টেকসই যুৎসই হতে পারে না। এটাই প্রকৃতির বিধান যে ‘শুধুমাত্র যোগ্যতমই টিকে থাকবে’। প্রকৃতি—সৃষ্ট হরেক রকম জিনিসকে সমতায় আনা সম্ভব নয়, বিধেয়ও নয়Ñভিন্ন ভিন্ন জিনিসকে ভিন্ন ভিন্নভাবে গণ্য করলেই বরং তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটবে। যত চেষ্টাই করি, একটি গাছের সবগুলি আমকে ‘সমান’ করতে পারব না, তেমনি একটি সমাজের সব মানুষকেও সমান করা যাবে না। তবে আমাদের এই পারস্পরিক পার্থক্য আমাদেরকে অন্যের চেয়ে মহান বা হীন করবে না, এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেই সমাজ সুসংহত হবে।
পৃথিবীর অনেক ধনী—সুখী মানুষ দান—খয়রাতে উৎসাহবোধ করে না, মানুষের কষ্টে তাদের দুঃখবোধ তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই দারিদ্র কষ্ট বঞ্চনায় তার যদি ভ্রম্নক্ষেপ না থাকে, মানুষ কেন তাতে হস্তক্ষেপ করে লাঘবের মিছে চেষ্টা করবে? মেধায় শক্তিতে বুদ্ধিতে সুযোগে যিনি ভিন্নতার সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই বুঝেই বৈচিত্র্য রক্ষা করতে চান। এই প্রকৃতিকে অনেকে বলেন ‘ভাগ্য’। কেন ভাগ্য, পরিশ্রম নয় কেন? শুধু পরিশ্রম দিয়ে কিছু হয় না, ভাগ্য লাগে অর্ধেক। অন্তত ফিফটি ফিফটিÑতা না হলে গনি মিয়া অন্যের জমি চাষ না করে জমিদার হয়ে বসত।
কোনোলোক কোনোদিন কোনোভাবে সমাজের বৈষম্য বৈপরীত্য দূর করতে পারবে না। কিছুলোক জীবনভর সুখে থাকবে প্রাচুর্যে, কেউ থাকবে আজীবন কষ্টে দারিদে্র্য। ধর্মের বাণী, দানশীলের দাক্ষিণ্য, রাষ্ট্রের সহায়তা, ভাবুকের লেখনীÑকিছুতেই কিছু হবে না, এই অপরিবর্তনীয় বৈষম্য যাবে না। দেখে মনে হয় প্রকৃতিও সাম্যবাদে বিশ্বাসী নয়!
তবে মানুষের ভূমিকা ও কর্ম ভিন্ন হতে পারে, অধিকার হবে সমান। অন্তত সুযোগ প্রাপ্তি ও প্রদানের সমতা দাবী করা যায়, বাস্তবে যদিও প্রাপ্তি বা ফলাফলের সমতা নেই। সেজন্যই Dick Feagler বলেছেন, Equality of opportunity is freedom, but equality of outcome is repression । যে কারণে এমন শ্রম্নতিমধুর সাম্যবাদ টেকেনি। Capitalism is like a race, only one will be on top, then second, third,....last—loser, gainer, victorious but no regret for that । প্রকৃতিতেও তাইÑযে যার যোগ্যতা অনুযায়ী টিকে থাকে। সেজন্যই মনে হয় পৃথিবীর সব মানুষকে জোর করে সমান করতে যাওয়ার অর্থ হল প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করা। সেজন্যই কি সোশালিজম ব্যর্থ ?
চিরন্তন সত্য হল, মানুষে মানুষে পার্থক্য আছে, সমতা নেই। যেখানে প্রকৃতির রাজ্যে সমতার বিধান নেই, মানুষ কী করে সমাজে সমতা বিধান করবে? সমজাতের হয়েও সকল বৃক্ষ সমান নয়, সকল পশু—পাখি—মৎস্য কিংবা গ্রহ—তারা সমান নয়। মহাবিশ্বে কেউ কারো সমান হতে পারে না। তবে পূর্ণ নয়, আপেক্ষিক সমতার ধারণা কল্পনা করা যায়। যেমন, কারো জন্য বিশেষ সুবিধাদির ব্যবস্থা থাকবে না। কিন্তু তা—ই বা কী করে সম্ভব? ক্ষমতাবানদের জন্য রয়েছে ‘ভিআইপি অ্যারেঞ্জমেন্ট’, ধনবানদের জন্য ফাস্টর্ক্লাস টিকেট, সেলিব্রেটিদের প্রমোদকুঞ্জ।
শেষকথা, এই অসমতাকে নেতিবাচকভাবে না দেখে প্রাকৃতিক স্বাভাবিকভাবে দেখলেই অন্যায় অবিচার বঞ্চনার দুর্ভাবনা মাথায় আসবে না। সমতাবিধানের সংগ্রাম না করে, সমতাপ্রতিষ্ঠার দুঃস্বপ্নে সময় না কাটিয়ে কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ো। যেদিন তুমি ওপরে উঠবে, যথারীতি নীচের কথা ভুলে যাবেÑঅন্তত বিদ্যমানাবস্থা/স্ট্যাটাসকূ বজায় রাখতে চাইবে। আর সবাইকে চিরকাল এককাতারে দাঁড় করিয়ে রাখার অলৌকিক ইউটোপিয়ান চিন্তা আসেই বা কীভাবে মাথায়। যেখানে অবধারিতভাবে পৃথিবীর সবকিছু আধাআধিÑধনী—গরিব, সবল—দুর্বল, সুবোধ—অবোধÑসেখানে সমতার ধারণাও পুরোপুরি সত্য হতে পারে না, নেহাত হতে পারে আধাআধি সত্য।
